প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অণুজীবের অদৃশ্য জগত, যা চোখে দেখা যায় না, জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে, এবার পেট্রি ডিশে দৃশ্যমান হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার কালচার ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে এসব নকশা, যা কখনো গোলাপ, কখনো গাছের শাখা-প্রশাখার মতো, আবার কখনো কোষ বা বিভিন্ন প্রতীকী অবয়বের আকারে ফুটে উঠেছে। এই ব্যতিক্রমী বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনার পেছনে রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা।
আন্তর্জাতিক অণুজীব দিবস উপলক্ষে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয় এসব ব্যাকটেরিয়াল কালচার। র্যালি, সমাবেশ, অণুজীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের গ্র্যান্ড ফাইনাল, ইনোভেশন শোকেস, ‘মাইক্রোবস ডিসকভারি কর্নার’ এবং বায়োফার্টিলাইজার প্রদর্শনীর পাশাপাশি পেট্রি ডিশে তৈরি এসব ফর্মেশন দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কালচার মিডিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটিয়ে নান্দনিক এসব ফর্মেশন তৈরি করেছেন। কোথাও ব্যাকটেরিয়ার কলোনি গাছের ডালপালার মতো ছড়িয়ে পড়েছে, কোথাও ফুলের অবয়ব ফুটে উঠেছে। আবার কোনো পেট্রি ডিশে দেখা গেছে কোষের প্রতিকৃতি, অন্যটি প্রকৃতির দৃশ্যের মতো। দূর থেকে এগুলোকে সাধারণ শিল্পকর্ম মনে হলেও, নিকট থেকে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি রেখা ও নকশার পেছনে রয়েছে অণুজীবের বৃদ্ধি।
প্রদর্শনীতে থাকা পেট্রি ডিশগুলোর মধ্যে একটি ‘The Eternal Tree’ নামে পরিচিত, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে ব্যবহার করে গাছের মতো বিস্তৃত ফর্মেশন তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘The Prokaryotic Cell’ প্রদর্শন করে অণুজীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে। এছাড়া ‘Roses’, ‘The Phoenix’, ‘The Pursuit of Knowledge’, ‘Swimming’ এবং অন্যান্য সৃজনশীল ফর্মেশনও প্রদর্শিত হয়েছে। প্রতিটি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কালচার মিডিয়া ও অণুজীবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু নান্দনিকতা নয়, প্রদর্শনীতে অণুজীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। Escherichia coli, Staphylococcus aureus, Staphylococcus epidermidis, Klebsiella pneumoniae এবং বিভিন্ন Vibrio প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার কালচার প্রদর্শনের পাশাপাশি E. coli-এর জন্য MacConkey ও EMB এবং Vibrio প্রজাতির জন্য TCBS-এর মতো কালচার মিডিয়ায় অণুজীবের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৃদ্ধিও দেখানো হয়েছে।
বিভিন্ন পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার কলোনির রং, আকার, বিস্তার ও বৃদ্ধির ধরন আলাদা। ফলে একই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা অণুজীবের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কালচার, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার অভিজ্ঞতার বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়েছেন।
অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ ছিল অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে তোলা। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া বলতে চোখের সামনে কোনো দৃশ্যমান অবয়ব কল্পনা করা কঠিন। তবে উপযুক্ত কালচার মিডিয়া ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাদের বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা সেই অদৃশ্য জগতকেই পেট্রি ডিশে নান্দনিক রূপ দিয়েছেন।
এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় বিজ্ঞান ও শিল্পের এক ভিন্ন ধরনের মেলবন্ধন দেখা গেছে। তারা শিখেছেন কীভাবে নির্দিষ্ট কালচার মিডিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং সেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো সৃজনশীল উপস্থাপনা তৈরি করেছেন।
আন্তর্জাতিক অণুজীব দিবসের মূল আয়োজনেও অণুজীবের গুরুত্ব, গবেষণা ও জনসচেতনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান র্যালিতে শিক্ষার্থীদের প্রদর্শিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে বিশেষ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক বার্তার প্রশংসা করেছেন। বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিনা আক্তার মানবদেহ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অণুজীবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন।
সেই বড় আয়োজনের মধ্যে পেট্রি ডিশে তৈরি এসব ব্যাকটেরিয়াল ফর্মেশন যেন অণুজীববিজ্ঞানের আরেকটি গল্প বলেছে—যে জীবকে খালি চোখে দেখা যায় না, তাকেও বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা সম্ভব। যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন তাই কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; এটি তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান, গবেষণামুখী চিন্তা ও সৃজনশীলতার এক অভিনব প্রকাশ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন