প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
স্বর্ণের দাম জানুয়ারিতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছুঁয়েছে। তবে তারপর থেকে সেই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখতে পারেনি স্বর্ণ; বরং দাম অনেকটাই কমে এসেছে। এতে বাজারে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা কি এটিকে নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখবেন, নাকি এটাকে দামের স্বাভাবিক ওঠানামা হিসেবে নেবেন, সে বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস বলে, স্বর্ণের দাম বড় ধরনের উত্থানের পর সাধারণত কিছুটা সংশোধন বা দরপতনের মধ্য দিয়ে যায়। বর্তমানে এই ওঠানামাকে অনেক বিশ্লেষক কৃষকের স্বাভাবিক চক্রের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিগত দুই দশকের মূল্য ইতিহাস বলছে, শক্তিশালী উত্থানের পর প্রায়ই বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। যেমন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ২৪৫ শতাংশ বেড়েছিল, তবে সেই লাভের বড় অংশ পরবর্তীতে স্থিতিশীল থাকে। এর আগে ২০০৮ সালের অক্টোবরে প্রতি আউন্স ৬৯৭.৪৫ ডলার থেকে বেড়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ১,৮৮৪.৪০ ডলারের রেকর্ডে পৌঁছায় স্বর্ণ। এরপর ২০১৮ সালের আগস্টে তা ৩৭ শতাংশ কমে ১,১৯১.৩৫ ডলারে নেমে আসে।
পরবর্তীতে আবার ২০২০ সালের আগস্টে দাম ৭৪ শতাংশ বেড়ে ২,০৭২.৪৯ ডলারের সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম ২২ শতাংশ কমে ১,৬২০.২০ ডলারে নামে। এই দীর্ঘমেয়াদি ধারার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে যে দাম যত বেশি বাড়ে, পরবর্তী পতনও তত বড় হয়ে ওঠে। আবার ঊর্ধ্বগতির তুলনায় পতনের সময় সাধারণত দীর্ঘ হয় না।
২০২২ সালের পর স্বর্ণের দাম আবার দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২৯ জানুয়ারিতে আউন্সপ্রতি ৫,৫৯৪.৮২ ডলারে পৌঁছে সর্বকালের রেকর্ড গড়ে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমে বৃহস্পতিবার (৪ জুন, ২০২৬) দাঁড়াচ্ছে ৪,৪৭৩.৮৯ ডলারে। ইতিহাস অনুযায়ী, এই পতন বড় কোনো ধস নয়, বরং তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি সংশোধন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগের উত্থান-পতনের ধারা যদি আবারও অনুসরণ করে, তাহলে আগামী মাস বা বছরগুলোতে আরও বড় পতনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এইবার পরিস্থিতি কি আগের মতোই? বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উত্থান একাধিক শক্তিশালী কারণ একসঙ্গে কাজ করার ফল। এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বড় পরিমাণে স্বর্ণ কেনা, চীন ও ভারতের শক্তিশালী খুচরা চাহিদা এবং বিনিয়োগকারীদের ‘ভয়ভিত্তিক লেনদেন’ বা ফিয়ার ট্রেড।
এই ফিয়ার ট্রেডের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে এমন ধারণা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কেনাকাটা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের ভোক্তা চাহিদাও কমেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ২৪৩.৭ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছে। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি, তবে এটি আগের কয়েক বছরের উচ্চ পর্যায়ের চেয়ে কম। ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালের শেষে প্রতি ত্রৈমাসিকে ৩০০ টনের বেশি কেনাকাটা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ২০০ টনের আশেপাশে স্থিতিশীল রয়েছে। একই সময়ে চীন ও ভারতে গহনার চাহিদাও কমেছে। চীনে চাহিদা ৩১ শতাংশ এবং ভারতে ১৯ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী গহনার চাহিদা ২৫ শতাংশ কমে ২৬০.২ টনে নেমেছে।
উচ্চ দামের কারণে সাধারণ ভোক্তার চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে ভারত সরকারও সোনা আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে স্বর্ণ-সমর্থিত এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে বিনিয়োগ প্রবাহও কমেছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক স্বর্ণের মোট চাহিদা ৯ শতাংশ কমে ১,১৯৫.৯ টনে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণে জানুয়ারির সর্বোচ্চ দাম থেকে যে তুলনামূলক ছোট পতন দেখা গেছে, সেটি এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক সংশোধন হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো; এই মুহূর্তে স্বর্ণের দাম মৌলিক চাহিদার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে মুদ্রানীতির প্রত্যাশার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দামের সঙ্গে স্বর্ণের সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়লে স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি হয়, আবার শান্তিচুক্তির সম্ভাবনায় তেলের দাম কমলে স্বর্ণ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। কারণ তেলের দাম মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা ও সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।
উচ্চ সুদের হার স্বর্ণের মতো আয়হীন সম্পদের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়, আর সুদের হার কমার প্রত্যাশা স্বর্ণকে সমর্থন দেয়। তাই বর্তমানে স্বর্ণ শুধু সরবরাহ-চাহিদার নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও সুদের হার প্রত্যাশার জটিল সমীকরণের মধ্যে আটকে গেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন