১১:৪৫ পি.এম
শেরপুরের নদী, খাল এবং বিলাঞ্চলে চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করে দেশীয় প্রজাতির মাছ নিধন চলছে ব্যাপকভাবে। এর ফলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। জানা গেছে, মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের পর এখন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে দেশীয় মাছ শিকার করা হচ্ছে। মৎস্য বিভাগের অভিযানের খবর দুর্নীতিপরায়ন লোকদের মাধ্যমে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
দেশীয় মাছ নির্বিচারে ধরে সাবার করা হচ্ছে। এই জালের ব্যবহার এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শেরপুর জেলার বিলাঞ্চলের পানি হ্রাস-বৃদ্ধি ও মাছের প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা পুঁটি, ট্যাংরা, কই, শিং, বোয়াল, শোল, টাকিসহ দেশী প্রজাতির মাছ চায়না দুয়ারির ফাঁদে নিধন হচ্ছে।
এতে নদী-নালা, খাল-বিল ক্রমেই মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। আইন অনুযায়ী দেশে মাছ ধরার যে সব জালের অনুমোদন রয়েছে, সেগুলোর ফাঁসের একটি গিট থেকে আরেক গিটের দূরত্ব নূন্যতম সাড়ে ৪ সেন্টিমিটার হতে হয়। এর চেয়ে ছোট ফাঁস হলে সে জাল আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। চলতি বছরেই চায়না দুয়ারি নিষিদ্ধ জালের তালিকাভুক্ত হয়েছে। জেলা এবং ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী ও নকলা বিভিন্ন হাট-বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল বিক্রি করছেন।
আরও পড়ুন: বাকেরগঞ্জে প্রান্তিক পেশাজীবীদের ১০ দিনের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন, সনদ বিতরণ
হাতের কাছে এবং সহজলভ্য হওয়ায় পেশাদার জেলে ও সাধারণ মানুষ এ জাল কিনছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নালিতাবাড়ী উপজেলায়ও এই জাল ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ফাঁসের এই জালে আটকা পড়ে শুধু দেশি মাছই নয়, আটকা পড়ছে সব প্রজাতির জলজ-জীব। স্বল্প ব্যয়ে এবং কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরতে বিপজ্জনক এই জাল ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
জালের মালিকরা বলছেন, "এমন কোনো মাছ নেই যা এই জালে ধরা পড়ে না।" সচেতন মহল বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের বিলুপ্তির শঙ্কা প্রকাশ করছে। মৎস্য বিভাগ বলছে, "এই জাল সর্বনাশা। এটা বন্ধ করা হবে।" জানা গেছে, লোহার রডের গোলাকার বা চতুর্ভুজ আকৃতির কাঠামোর চারপাশে চায়না জাল দিয়ে ঘিরে এই ফাঁদ তৈরি করা হয়।
ক্ষেত্রভেদে চায়না দুয়ারি ৫২ থেকে ৭০ হাত পর্যন্ত লম্বা হয়। এই ফাঁদ দিয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলার ধলি বিল, গজারমারি, বগাডুবি, বাতিয়া বিল, কাটাখালি ইত্যাদি ও নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান, নয়াবিল, বাঘবেড়, যোগানিয়া ও কলসপাড় ইউনিয়নের নদী, খাল-বিলে মাছ শিকার করছেন জেলেরা।
স্থানীয়দের মতে, এই ফাঁদ বসালে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। জালের ছিদ্র ছোট হওয়ায় ছোট-বড় কোনো মাছ বের হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলে দেশি মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে অন্তত কিছুটা হলেও রক্ষা পেত।
আরও পড়ুন: চারঘাট সিমান্তে বিজিবির অভিযানে মদ, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজা জব্দ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে বলেন, "আগে কারেন্ট জাল ব্যবহার করলেও চায়না দুয়ারি আসার পর সেটি বাদ দিয়েছি। কারণ কারেন্ট জালের চেয়ে চায়না দুয়ারিতে মাছ বেশি পাওয়া যায়। ৪০ হাজার টাকা খরচ করে আটটি চায়না দুয়ারি কিনেছি।"
কলসপাড় ইউনিয়নের কয়েকজন জেলের ভাষ্য, চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরা ঠিক নয়। তবে জীবিকার তাগিদে মাছ ধরছেন তারা। তারাকান্দি এলাকার মৎস্য চাষি আব্দুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, "এখন চায়না জাল দিয়ে যেভাবে ছোট মাছ ধরা হচ্ছে, তাতে শুষ্ক মৌসুমে মাছের আকাল পড়বে।" তিনি এই জাল নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে বলেন, "যারা চায়না জাল দিয়ে পোনা মাছ ধরে টাকা রোজগার করছেন, তারাই এক সময় আফসোস করবেন।" নালিতাবাড়ী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, "চায়না দুয়ারি জাল বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচার চলছে। শিগগির এই জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলেরা জানান, চায়না দুয়ারি জালে ফাঁসের আকার সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের চেয়েও অনেক কম। এজন্য এই জালে সব ধরনের মাছ ছেঁকে ওঠে। শুধু তাই নয়, মাছের ডিম পর্যন্ত আটকে যায় এই জালে। সহজেই মাছ ধরা যায় এবং দাম কম হওয়ায় অধিকাংশ জেলে এখন চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করেন। অনেক শৌখিন মৌসুমি মৎস্য শিকারিও মাছ ধরতে নেমেছেন।
ফলে যারা পুরোনো কৌশলে মাছ ধরতেন, তাদের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে চায়না দুয়ারি কিনছেন। নদীতে চায়না জাল বন্ধে মৎস্য বিভাগের তৎপরতা অনেকটাই দায়সাড়া গোছের বলে জানা গেছে। ফলে প্রকাশ্যেই অনেকে চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করেই মাছ ধরছেন। দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় সব মাছ ও নদীতে থাকা জলজ প্রাণী ধরা পড়ে।
আরও পড়ুন: কাউখালীতে কঁচা নদীতে অভিযান, ৫ হাজার মিটার অবৈধ সুতার জাল জব্দ
এমনকি ছেঁকে ওঠে মাছের ডিমও। এ জাল দিয়ে মাছ ধরলে কিছুদিন পর হয়তো নদী-নালা খাল-বিলে আর কোনো মাছ পাওয়াই কঠিন হবে। তারা আরো বলেন, "কারেন্ট জালে খরচ বেশি হওয়ায় এখন চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরি। কারেন্ট জালের চেয়ে চায়না দুয়ারিতে মাছ বেশি পাওয়া যায়।"
অপর এক জেলে বলেন, "আমি অনেক বছর থেকে মাছ ধরে জীবিকানির্বাহ করি। এখন অধিকাংশ মানুষ চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ ধরেন। বাড়ির কাছের হাট-বাজারগুলোতে আকারভেদে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় এ চায়না দুয়ারি জাল।" জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা বলেন, "এসব বেআইনি জাল জব্দ করার জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন