প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বিদ্যমান ব্রিটেনের। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই সম্পর্ক বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য সেখানে যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও সামরিক পরামর্শক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার জানাচ্ছে, এই সহায়তার উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি করা। তবে হুথিদের ওপর হামলা চালানোর উদ্দেশ্য নেই।
ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর টাইফুন যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা প্রদান করবে। এ ছাড়া এ৪০০এম পরিবহন বিমান ও সামরিক পরামর্শকরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য হলো, এই সহায়তা সৌদি আরবকে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ব্রিটেনের নতুন পদক্ষেপকে দুই দেশের দীর্ঘ সামরিক সম্পর্কের সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সম্পর্কের সূচনা ঘটে। সৌদি আরবের সঙ্গে ব্রিটেনের সামরিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা পার্সি কক্স ও আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের মধ্যে দারিন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ইবনে সৌদকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল ব্রিটেন।
১৯২৭ সালে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। পাঁচ বছর পর, ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
যুদ্ধবিমান কেনা থেকে সামরিক সহযোগিতা
১৯৬৬ সালে সৌদি আরব ব্রিটেনের কাছ থেকে ৪০টি লাইটনিং যুদ্ধবিমান, ২৫টি প্রশিক্ষণ বিমান ও রাডার কেনে। সেই সময় ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ চলছিল। সৌদি আরবের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স সুলতান সৌদি বাহিনীর সহায়তায় ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি স্কোয়াড্রন চেয়েছিলেন। ব্রিটেন সৌদি পতাকার অধীনে ব্রিটিশ পাইলট ও যুদ্ধবিমান পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর আলাদা স্কোয়াড্রন মোতায়েনের প্রয়োজন হয়নি।
১৯৬৬ সাল থেকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমসের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৮৫ সালে দুই দেশের মধ্যে আল-ইয়ামামা নামে বড় অস্ত্র চুক্তি হয়। এর আওতায় সৌদি আরব টর্নেডো ও হক যুদ্ধবিমান কেনে। চুক্তির অংশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ছয় লাখ ব্যারেল তেল পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল ব্রিটেনের।
এই চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০০৪ সালে ব্রিটেনের গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত দপ্তর তদন্ত শুরু করে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদিতে ব্রিটিশ বিমান ছিল। ১৯৯০ থেকে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর টর্নেডো যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের ধাহরান ও তাবুক ঘাঁটি থেকে অভিযান চালায়। ওই যুদ্ধে ব্রিটেনের একটি টর্নেডো যুদ্ধবিমান হারিয়ে যায়। পরে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ ইরাকে নো-ফ্লাই জোন কার্যকর রাখার অভিযানে অংশ নেয় ব্রিটিশ বিমানবাহিনী।
২০০৭ সালে সৌদি আরব ৪৪৩ কোটি পাউন্ডে ৭২টি টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করে। ২০১৮ সালে আরো ৪৮টি টাইফুন কেনার পরিকল্পনা করা হলেও তা আটকে যায়। সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার পর জার্মানি সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র রপ্তানিতে বাধা দিয়েছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জার্মানি সেই আপত্তি তুলে নেয়। এরপর সৌদি আরবের সঙ্গে টাইফুন যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা আবার শুরু করে বিএই সিস্টেমস।
ইয়েমেন যুদ্ধে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের ভূমিকার কারণে দেশটির কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। ২০১৯ সালে ব্রিটেনের আপিল আদালত রায় দেয়, ইয়েমেনে ব্যবহারের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমতি দেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অতীত ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করা হয়নি। এ কারণে ওই অনুমতিগুলো বেআইনি ছিল।
২০২০ সালের জুলাইয়ে ব্রিটিশ সরকার আবার অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেয়। সরকারের যুক্তি ছিল, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন গুরুতরভাবে লঙ্ঘনের স্পষ্ট ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হুথিদের হামলার জবাবে ২০২৪ সালে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অংশ নেয় ব্রিটিশ টাইফুন যুদ্ধবিমান। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও সৌদি আরবে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর টাইফুন যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভয়েজার ট্যাংকার বিমান পাঠায় যুক্তরাজ্য।
সৌদি আরবকে হুথিদের হামলা থেকে রক্ষায় এবার নতুন করে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান ও সামরিক সহায়তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিকতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শুরু হওয়া এই সম্পর্ক বর্তমানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইয়েমেন সংঘাতের বাস্তবতায় নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন