প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুর্গাপূজার বিসর্জনের সময় শুধুমাত্র ‘সনাতন ধর্মে’ বিশ্বাসী ব্যক্তিরা প্রতিমা স্পর্শ করার অনুমতি পাবেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই নির্দেশের ফলে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছে যে, এর মাধ্যমে রাজ্যে অস্পৃশ্যতা বা ছোঁয়াছুঁয়ির প্রথা পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার হুগলি নদীর তীরে বাবুঘাট পরিদর্শনের সময় মুখ্যমন্ত্রী এই নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি দাবি করেছেন যে, এই নির্দেশের পেছনে কোনো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নেই এবং বিসর্জনের আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে, প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের একটি রেকর্ড রাখা হবে। তিনি বলেন, ‘যারা সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করেন, কেবল তারাই প্রতিমা স্পর্শ করবেন। আমি সিপি-কে বলেছি যারা এখানে আসছেন, তাদের নাম রেকর্ড করতে হবে। তাদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে হবে।’
মুখ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘পবিত্রতা রক্ষায় আমাদের হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্য, শাস্ত্র ও নিয়ম মেনে চলতে হবে।’ এই মন্তব্যের ফলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি এবং সাংবিধানিক নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন।
সিপিএমের সাবেক সংসদ সদস্য বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তার (অধিকারী) কাছে কি কোনো তালিকা আছে কে সনাতনী আর কে নন? তিনি কি ব্যাখ্যা করতে পারবেন কীভাবে কেউ সনাতনী হয়ে ওঠেন? তার কাছে কোনো উত্তর নেই।’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি আরএসএসের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছেন।
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা সুমন রায় চৌধুরী মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি ভারতের বহুত্ববাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ মন্তব্য করেছেন, ‘এতটা সংকীর্ণ কিন্তু হিন্দুধর্ম নয়, হিন্দুধর্ম উদার। আপনি কি ধর্ম দেখে দেখে, জাতপাত দেখে দেখে, দেখতে যাবেন, এ ছোঁবে, এ ছোঁবে না। শ্রীরামকৃষ্ণ এ কথা বলে যাননি। স্বামী বিবেকানন্দ এই হিন্দুত্ব দেখিয়ে যাননি। শ্রী চৈতন্য দেব এই হিন্দুত্ব দেখিয়ে যাননি।’
এর আগে ঐতিহ্য বজায় রাখার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে বিসর্জনে ক্রেন ব্যবহার করা হবে না, পরিবর্তে ট্রলি ব্যবহার করা হবে এবং ডিজে গান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
তবে এই নির্দেশনা কলকাতার দুর্গাপূজার মণ্ডপ ও বিসর্জন ঘাটগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং দরিদ্র দিনমজুরদের জীবিকার ওপর বড় আঘাত হয়ে আসতে পারে। প্রতিবছর প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ নির্মাণ থেকে শুরু করে বিশেষ করে ভারী প্রতিমা বহন এবং গঙ্গায় বিসর্জনের কাজে যুক্ত থাকেন হাজার হাজার দিনমজুর। বিসর্জন ঘাটগুলোতে এই ভারী প্রতিমা কাঁধে নেওয়া ও নদীতে নামানোর কাজে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বহু মুসলিম ধর্মাবলম্বী দিনমজুরের পাশাপাশি আদিবাসী ও তফসিলি উপজাতিভুক্ত অ-সনাতনী শ্রমিকেরা কাজ করে থাকেন। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বংশপরম্পরায় এই শ্রম দিয়ে পরিবার চালান তারা।
কলকাতা পৌর করপোরেশনের (কেএমসি) তথ্য অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন বিসর্জন ঘাটে এই শ্রমিকেরাই প্রতিবছর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পূজা আয়োজক কমিটিগুলো যদি মুখ্যমন্ত্রীর এই সামাজিক নির্দেশ মেনে চলে, তবে এই শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ বিসর্জনের কাজে অংশ নিতে পারবে না। ফলে উৎসবের মৌসুমে তাদের নিশ্চিত উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা পৌর করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের অন্দরে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অ-সনাতনী এই দিনমজুরেরা যদি কাজ হারান, তবে বিসর্জনের ঘাটে তাদের বিকল্প হিসেবে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়ে সরকারের নীতি কী হবে সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন