প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবক সমাবেশে আওয়ামী লীগের এক নেতার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষক মো. মতিয়ার রহমান ফকিরকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। প্রধান শিক্ষকের লাঞ্ছনাকে ঘিরে প্রতিবাদ স্বরূপ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে ক্লাস ছেড়ে বিদ্যালয় মাঠে বিক্ষোভ শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে প্রথম ঘণ্টার পাঠদান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্লোগান দেয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। খবর পেয়ে কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মুনছুর রহমান বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে শিক্ষার্থীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।
কর্মকর্তার আশ্বাস পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাকির হোসেন বলেন, ‘অফিসে ঢুকে আমাদের স্যারকে (প্রধান শিক্ষক) চড় মারা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে।
অন্যথায় আমরা পাঠদান বর্জনের কর্মসূচি দেব।’
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার পর দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে বিদ্যালয়ে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে পুনট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ফকির উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
এ ঘটনার পর গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে স্থানীয় ১০-১৫ জনের মধ্যে ইয়াসিন আলী বিদ্যালয়ে যান। তিনি গালাগাল করতে করতে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে একপর্যায়ে তাঁকে চড় মারেন। পরে আরো কয়েকজন ব্যক্তি কক্ষে ঢুকে প্রধান শিক্ষককে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করলে ওই ব্যক্তিরা বিদ্যালয় থেকে চলে যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সিসিটিভি ফুটেজে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বুধবার সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে প্রধান শিক্ষক কক্ষে বসে দাপ্তরিক কাজ করছিলেন। এ সময় একজন ব্যক্তি ঢুকে তাঁর সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি প্রধান শিক্ষককে চড় মারেন। প্রধান শিক্ষক উঠে দাঁড়ালে ওই ব্যক্তি তাঁকে টেনে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে আরো কয়েকজন কক্ষে ঢুকে তাঁকে নিতে চাইলে তাঁরা সফল হননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষক আওয়ামী লীগপন্থী হওয়ায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ‘জুলাইয়ের একাধিক মামলার আসামি’ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস ফকিরকে অভিভাবক সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার ও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এ ঘটনার উদ্দেশ্য স্থানীয় রাজনীতিতে একটি হট্টগোলের ইস্যু তৈরি করাও হতে পারে।
প্রধান শিক্ষক মো. মতিয়ার রহমান ফকির বলেন, ‘অভিভাবক সমাবেশে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে তাঁর নিকটাত্মীয় আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ফকির এসেছিলেন। আমরা তাঁকে দাওয়াত করিনি। ফেসবুকে সমাবেশের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল শিক্ষক কক্ষে কাজ করার সময় ইয়াসিন আলী গালিগালাজ করতে এসে আমাকে লাঞ্ছিত করেন। এরপর তাঁকে টেনে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেন।’
তিনি আরো জানান, ‘ইয়াসিন আলী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেনের নিকটাত্মীয়। আমার লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছে। পরে তাদের বুঝিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরানো হয়েছে।’
তবে প্রধান শিক্ষককে চড় মারার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইয়াসিন আলী। তিনি বলেন, ‘এখন বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। অথচ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সমাবেশে বিএনপির কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি প্রধান শিক্ষক। জুলাইয়ের একাধিক মামলার আসামি আওয়ামী লীগের নেতাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রধান শিক্ষকের কাছে জবাব চাইতে যাওয়া হয়েছিল।’
কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মুনছুর রহমান বলেন, ‘মঙ্গলবার পুনট উচ্চবিদ্যালয়ে অভিভাবকদের নিয়ে সমাবেশ হয়েছে। সেখানে একটি রাজনৈতিক দলের নেতার উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ ছিল। এর ফলে কিছু বহিরাগত সদস্য প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আজ বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় মাঠে বিক্ষোভ করেছে এবং তাঁরা লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ইউএনও বরাবর এক লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। ইউএনও আমাকে বিষয়টির তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।’
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুনট উচ্চবিদ্যালয়ের অভিভাবক সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস ফকির উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনার কারণে প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন