প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের রাজস্থানের কিশানগড়ে মার্বেল শিল্পের বর্জ্য ফেলার একটি বিশাল এলাকা বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাদা বর্জ্যের পাহাড় এবং নীল পানির কৃত্রিম জলাশয় দেখতে প্রতিদিন সেখানে শত শত মানুষ ভিড় করছেন। পর্যটকেরা মন্তব্য করছেন যে, জায়গাটি কাশ্মীরের মতো দেখতে। নবদম্পতি ও হবু দম্পতিরা সেখানে ছবি তুলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকেরা সেখানে ভিডিও তৈরি করছেন। এমনকি সিনেমা ও গানের দৃশ্য ধারণের জন্যও জায়গাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ভয়াবহ পরিবেশদূষণ। বর্জ্যের ধুলায় আশপাশের গ্রামের মানুষের শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা ও অন্যান্য রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হচ্ছে।
রাজস্থানের আজমের জেলার কিশানগড় শহরে প্রায় ৩০০ একর (১২১ হেক্টর) জায়গায় মার্বেল শিল্পের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে জায়গাটির নাম ‘স্নো ইয়ার্ড’। এটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় মার্বেল বর্জ্য ফেলার স্থান। সাদা বর্জ্যের পাহাড় এবং পানি জমে থাকা গর্তগুলো দূর থেকে বরফে ঢাকা প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো মনে হয়। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো ফি দিতে হয় না।
নবদম্পতিরা সাদা পাহাড়ের সামনে এবং নীল কৃত্রিম জলাশয়ের পাশে ছবি তুলছেন। হবু দম্পতিরাও বিয়ের আগে ছবি তোলার আয়োজন করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকেরা সেখানে গিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন। নিয়মিত গানের ভিডিও ও সিনেমার শুটিংও হচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের ব্যবসায়ী সেলিম শাহজাদা আলজাজিরাকে বলেন, “আমার পাঁচ বছর বয়সি ভাগনি থেকে শুরু করে মা—সবাই জায়গাটি খুব পছন্দ করেছেন। তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, জায়গাটি দেখতে কাশ্মীরের মতো।”
শাহজাদা জানান, তিনি আগেও কয়েকবার সেখানে গিয়েছেন। এবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন। তবে ভাগাড়টির কারণে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যার বিষয়ে তার ধারণা ছিল না।
তিনি বলেন, “এই জায়গা সম্পর্কে বা এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। শুধু জানি, এখানে মার্বেল কাটার বর্জ্য ফেলা হয় এবং পাহাড়টি ওই বর্জ্য দিয়েই তৈরি।”
ভাগাড় থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ভোগিয়াওয়াস গ্রাম অবস্থিত। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ৫৩ বছর বয়সি বাগারাম গুর্জর। নিজের ভুট্টাখেতে আগাছা পরিষ্কার করার সময় পাশেই তার স্ত্রীর কাশির শব্দ শুনে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন।
গুর্জর বলেন, “মাটির ওপর ধুলা জমলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়।”
তার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাশিতে ভুগছেন। কাশির ফাঁকে তিনি বলেন, “ঈশ্বর যেন সব ঠিক করে দেন। তা না হলে ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
মার্বেল ও গ্রানাইট শিল্পের বড় কেন্দ্র কিশানগড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান গ্রানাইট অ্যান্ড স্টোন ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় প্রতিদিন মোট ১৬ কোটি রুপির (প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার) বেশি ব্যবসা হয়। এ শিল্পে কাজ করেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।
প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ট্যাংকারে করে মার্বেল বর্জ্যের তরল মিশ্রণ বা স্লারি এনে সরকারি নির্ধারিত ভাগাড়ে ফেলা হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য জমা হয়। আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য এই ভাগাড় এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে।
বাগারাম গুর্জরের ভাষ্য, ভাগাড়টির কারণে অন্তত ছয়টি গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, “কত সমস্যার কথা আর বলব? এক–দুটি সমস্যা হলে হয়তো সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু এই ভাগাড়ের কারণে প্রায় সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। আমার মতো মানুষ বুকে সংক্রমণ, দাঁতের সমস্যা ও ত্বকের অ্যালার্জিতে ভুগছেন। শিশু হোক বা বৃদ্ধ—কেউই বাদ যাচ্ছেন না।”
গুর্জর জানান, বুকের সংক্রমণ ও ত্বকের সমস্যার কারণে তাকে এবং তার স্ত্রীকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।
আজমেরের গঙ্গা নারায়ণ হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসক অদিতি গোয়াল বলেন, কিশানগড়ের বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও ত্বকের রোগ প্রধান। মার্বেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার শ্রমিকেরা দীর্ঘ সময় বিষাক্ত ধুলার সংস্পর্শে থাকায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।
অদিতি গোয়াল আলজাজিরাকে বলেন, “গত কয়েক বছরে এই এলাকায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কারণ, মানুষ ভাগাড় থেকে ছড়িয়ে পড়া ধুলার সংস্পর্শে আসছেন।”
তবে শিল্পবর্জ্যের ধুলাই একমাত্র সমস্যা নয় বলে জানান এই চিকিৎসক। তার ভাষ্য, কিশানগড়ের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ করেন। মাটি থেকে উড়ে আসা ধুলার কারণেও তারা সংক্রমণে আক্রান্ত হন। ধুলা থেকে সুরক্ষায় তিনি বাসিন্দাদের মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
ভাগাড়ের ধুলা আশপাশের কৃষিজমিতেও জমছে। এতে মাটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে জমিতে ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজস্থানের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মার নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় কিশানগড়ের মাটিতে সিসা সিলিকেটের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি মাটিতে মারাত্মক দূষণের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় আরো বলা হয়, বর্জ্যের কণাগুলোর আকার ৭৫ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট। এ কারণে সেগুলো বাতাসে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মাটির উর্বরতা নষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া বাতাসে পিএম ২.৫ কণার ঘনত্বও পরিবেশের বায়ুমানের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এলাকার অনেক মানুষ সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভোগিয়াওয়াস গ্রামের আরেক বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সি উগাম সিংয়ের স্মৃতিতে একসময়কার কিশানগড় ছিল ভিন্ন রকম।
তার ভাষ্য, বছরের পর বছর মার্বেল বর্জ্যের স্লারি ফেলার কারণে ধীরে ধীরে এলাকার পরিবেশ ও মানুষের জীবন বদলে গেছে।
উগাম সিং বলেন, “এখন পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে ভূগর্ভস্থ পানিও আর পান করার উপযোগী নেই।”
তার দাবি, পানিতে ফ্লুরাইডের মাত্রা এত বেশি যে পানির স্বাদ নোনতা লাগে। তিনি নিজের দাঁত দেখিয়ে বলেন, দাঁত ক্ষয়ে যাচ্ছে এবং হাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার দাঁতগুলো ফ্যাকাশে, ক্ষয়প্রাপ্ত ও এবড়োখেবড়ো দেখাচ্ছিল।
সিং জানান, ভাগাড়ের আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদসহ (আরএসপিসিবি) বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তাদের আবেদনে কোনো সাড়া মেলেনি।
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি, ক্ষমতায় যে সরকারই থাকুক না কেন, গরিব মানুষের কথা কেউ শোনে না। ধনীদের আরো ধনী করতে সরকার আমাদের মতো মানুষের স্বার্থ বিসর্জন দেয়। মনে হয়, আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই।”
সিংয়ের কথায়, “এখনো আমাদের একটাই দাবি—মার্বেল বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা হোক। আমরা আবার মুক্তভাবে শ্বাস নিতে চাই। আমাদের জমিগুলো আবার সবুজ ও উর্বর হয়ে উঠুক।”
ভাগাড়ের আশপাশের সব গ্রামের বাসিন্দাদের যথাযথভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই হাঁপানির মতো শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যাবে বলেও দাবি করেন সিং।
গত বছর স্থানীয় পরিবেশকর্মী দ্রুপদ মালিক কিশানগড়ের ভাগাড়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে জাতীয় পরিবেশ আদালতে (এনজিটি) মামলা করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মার্বেল স্লারি ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি ও বায়ু দূষিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে নিয়মিত নজরদারি, নমুনা পরীক্ষা এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনকারী মার্বেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপের নির্দেশ দেন আদালত।
এ বিষয়ে কথা বলতে আলজাজিরা কিশানগড়ে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শর্মা মনে করেন, কিশানগড়ের ভাগাড়ের আশপাশের এলাকাগুলো মানুষের বসবাসের অনুপযোগী।
তিনি জানান, তার গবেষণার ফলাফল রাজ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এলাকার পরিবেশের উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শর্মা আলজাজিরাকে বলেন, “মানুষের সংস্পর্শের বাইরে অন্য কোথাও এই ভাগাড় সরিয়ে নেওয়া জরুরি। এলাকাটি অত্যন্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এখানে গুরুতর রোগের ঝুঁকিও অনেক বেশি। আমার অবাক লাগে, মানুষকে মাস্ক ছাড়াই এখানে ঘুরতে এবং এমনকি খাবার খেতেও দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, মার্বেল স্লারি ব্যবহার করে টাইলস তৈরি করা যায়। এ জন্য টাইলস তৈরির কারখানা স্থাপনের পরামর্শসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তিনি দিয়েছেন।
তার মতে, এতে কিশানগড়ের দূষণ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
ভোগিয়াওয়াস থেকে গাড়িতে প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে তোকারা গ্রাম। সেখানকার বাসিন্দা রাম লালও মার্বেল বর্জ্য ফেলার জন্য বিকল্প জায়গা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
রাম লাল আলজাজিরাকে বলেন, “কিশানগড় এখন স্লারিতে ভরে গেছে। তাই ভাগাড়টি এখান থেকে সরিয়ে এমন কোথাও নেওয়ার সময় এসেছে, যেখানে অন্তত আগামী দুই থেকে তিন দশক কেউ এর কারণে ভুগবে না।”
তিনি আরো বলেন, বছরের পর বছর ধরে বাতাসে উড়ে বেড়ানো এবং ঘরের আশপাশে জমে থাকা সূক্ষ্ম ধুলার কারণে যাদের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে, তাদের অবস্থা যাচাই করতে বিনা মূল্যে চিকিৎসাশিবির আয়োজনের দাবি জানাচ্ছেন তারা।
রাম লালের কথায়, “আমাদের গ্রামের কারো পক্ষে এমন কোনো রোগের চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব নয়, যাতে হাজার হাজার রুপি ব্যয় হয়।”
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন