প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানির স্তর আবার বাড়তে শুরু করেছে, ফলে নদীভাঙন আবার শুরু হয়েছে। গোদাগাড়ী পৌরসভার কুঠিপাড়া, বারুইপাড়া, রেলওয়ে বাজারের সামনে, মাওলানার গেট উপজেলা আলিপুর, চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের আষাড়িয়াদহ চর বয়ারমারী, চর নওশেরা, হবুপাড়া সহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা মালামাল সরানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। প্রতিবছর বন্যার সময় পানির বৃদ্ধি ঘটলে নদীভাঙন শুরু হয়, এবারের পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। এ বিষয়ে সম্প্রতি দৈনিক ইনকিলাবে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এর পর প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকাল সাড়ে ৫টায় ক্ষতিগ্রস্ত পৌর এলাকার কুঠিপাড়া, সারণপুর ও সুলতানগঞ্জ এলাকা পরিদর্শন করেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান। তাঁর সাথে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ল রিফর্ম কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন। তাঁরা ভাঙনকবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন এবং তাঁদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজখবর নেন। ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। পানির বৃদ্ধির কারণে কয়েক দফা বোনা মাসকলাই ডুবে গেছে। কৃষকদের বীজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা বিপদে পড়েছেন।
কুঠিপাড়া এলাকার বাসিন্দা নূরুল্লাহ ও মৃত ইয়াহিয়া চেয়ারম্যানের ছেলে মাসুদ জানান, "আমাদের এলাকার বাড়িঘর, দোকান, বহুতলা পুরাতন মসজিদটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পদ্মানদীর তীর সংরক্ষণের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।" নদীভাঙনে চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে কুঠিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফজাল সরকার বলেন, “নদী যেভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে আমরা চরম আতঙ্কে আছি। আমার যা কিছু ছিল সব তো নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। শেষ সম্বলটুকু শেষ হয়ে গেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমি কোথায় যাবো, তা ভেবে পাচ্ছি না।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, “পৌর এলাকার ভাঙন পরিস্থিতি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে বিস্তারিত কথা বলে বালুর বস্তা ফেলে কিছুটা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাঙন রোধে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
পরিদর্শনকালে ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন স্থানীয়দের আশ্বস্ত করেন এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলার আশ্বাস দেন। তবে এলাকাবাসীর দাবি, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা না হলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম ও স্থাপনা। পদ্মাপাড়বাসী ইয়াসিন আলী মাঝি জানান, রেলবাজার ঘাটের সামনে এক যুগ ধরে পলিমাটি পড়েছিল, কৃষকগণ চিনা, বাদাম, পাট, আম, করলা, পটল, মসুরি, ভুট্টা, কালাইসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। কিন্তু পদ্মায় পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের কারণে জমিগুলো নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। দুটি বটগাছ নদীতে ভেসে গেছে। দোকানগুলো কয়েক দফা সরিয়ে লাভ হচ্ছে না, আবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। নদীর ধার স্রোতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়ে বিকট শব্দ করে নদীর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
যুগে যুগে পদ্মার ভাঙন নিঃস্ব করেছে শত-সহস্র মানুষকে। অতীতের সেই দুর্বিষহ স্মৃতি যেন কঠিন বাস্তবতা হয়ে আবারও দরজায় কড়া নাড়ছে ভাঙনকবলিত মানুষের ঘরে। ফলে শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করার তাগিদ জানাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থানীয়রা। বন্যার পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
আশঙ্কা করেছিল নদীপারের বাসিন্দারা—প্রত্যেক বছরের মতো এবারও গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় দেখা দেবে তীব্র ভাঙন। সেই শঙ্কা সত্যি করে কিছুদিন ধরে প্রবল স্রোতের কারণে উপজেলার পদ্মাপাড়ের চর আষাড়িয়াদহ, চর বয়ারমারী, চর নওশেরা, হবুপাড়া, জামাইপাড়া, চর দিয়ার মানিকচকসহ আশপাশের এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে ধান, পাট, ভুট্টাসহ মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গৃহহীন হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবার, পানিতে তলিয়ে গেছে এক হাজার বিঘা জমির ফসল।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের মেম্বার জোহরুল ইসলাম জানান, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদ্মায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, তবে গত চার থেকে পাঁচ বছর যাবত প্রচুর পরিমাণ ভাঙন শুরু হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ বহু স্থাপনা। নদীভাঙনের ফলে বহু মানুষ তাদের ভিটেমাটি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, "আমাদের জমিজায়গা যদি পদ্মায় বিলিন হয়ে যায়, তাহলে আমরা যারা কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, কোথায় ফসল উৎপাদন করব, আমরা খাবো কী, কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবো? তাই আমি সরকারের কাছে আকুল আবেদন করে বলছি, আমাদের চর অঞ্চলের মানুষকে, জমিনকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করুন এবং দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকাজ যেন শুরু করেন।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নতুন বসতবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বিশেষ করে চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ১নং ও ২নং ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সাজানো সংসার চোখের সামনে মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেকেই।
ভাঙনের ভয়ে অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গোদাগাড়ীর অভ্যন্তরীণ গ্রামগুলোতে চলে গেছে। সেখানে তারা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বা অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রায় দেড় যুগ ধরে প্রতিবছর বন্যার পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হয়, এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। তবুও এই জনপদ অঞ্চলে হয়নি এখনও স্থায়ী বাঁধ।
পদ্মা নদীর ভাঙন একটি গুরুতর সমস্যা, যা গোদাগাড়ী চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। ভাঙনের কারণে অনেকে তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ফসলি জমি হারাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ভোলা বলেন, প্রতিদিনই নদীর পানি বাড়ছে, ভাঙন বন্যা তীব্র হচ্ছে, কয়েক শ বিঘা জমির মৌসুমি ধান বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে একতরফা ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল ভারত। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সরসেরগঞ্জ থানার একটি গ্রাম ফারাক্কা। এখানেই গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ১১৯টি লকগেটবিশিষ্ট যে বাঁধ দেওয়া হয়, সেটাই ফারাক্কা বাঁধ। ফারাক্কা থেকে ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁকা পয়েন্টেই গঙ্গা হয়েছে পদ্মা।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি মোতাবেক পানির যে হিস্যা পাওয়ার কথা আমাদের, তা আমরা পাচ্ছি না। গত বছর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে ১৫ হাজার কিউসেক পানির প্রবাহ কমেছিল।
চলমান ৩০ সাল চুক্তি বাংলাদেশের ন্যায্য পানিপ্রাপ্তির কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। আগের চুক্তিতে যতটুকু নিশ্চয়তা ছিল, এ চুক্তিতে তাও নেই। ফলে পানিবঞ্চনা আরও বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বক্তব্য খোলামেলা। শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ এত কমে আসে যে, তা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজনই মেটে না, বাংলাদেশকে আমরা পানি দেবো কীভাবে? আর বর্ষা মৌসুমে মরণ বাঁধ ফারাক্কার সব গেট খুলে দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে মারছে ভারত। প্রতিবছর বন্যার সময় ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদীভাঙন শুরু হয়। এবার শুরু হয়েছে।
রাজশাহী-১ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আমি গত কয়েক দিন পদ্মা নদীর ভাঙন এলাকায় গেছি। ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর ভাঙন, পানি বৃদ্ধি দেখেছি, অসহায় মানুষের সাথে কথা বলেছি। তারা স্থায়ী বাঁধের ব্যাপারে বলেছেন। বন্যার পানি কমে গেলে স্থায়ী বাঁধের জন্য আগামী সংসদ অধিবেশনে দাবি জানানো হবে ইনশাআল্লাহ।
সংস্কারের ব্যাপারে এ সংসদ আরও বলেন, ৫ বছরের জন্য ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকায় ১৬ ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভায় এমপির বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে সমহারে কাজ হবে ইনশাআল্লাহ।
উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের জন্য বিভিন্ন দপ্তর প্রধান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিবদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। উনারা আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন ও গোদাগাড়ী পৌরসভার এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার পদ্মানদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে। ইনশাআল্লাহ অচিরে হয়ে যাবে।
গোদাগাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এ কে এম মোমিনুল হকের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করে মোবাইল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন