প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের চার উপজেলার সঙ্গে বিভাগীয় নগরী রংপুরের যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তা নদীর ওপর ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘দ্বিতীয় তিস্তা সেতু’। সেতুটির সঙ্গে রংপুর নগরীকে যুক্ত করতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কও। কিন্তু সেতু ও সড়ক নির্মাণের পরও এর সুফল পাচ্ছে না পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলো।
সেতুর ওপর দিয়ে বাস ও ট্রাকসহ ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী যানকে লালমনিরহাট জেলা সদর হয়ে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে পরিবহন খরচ ও সময়, যার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ ভোক্তার ওপরও।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা এলাকার সঙ্গে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরকে যুক্ত করা ৮৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে রংপুরের যোগাযোগ সহজ করাই ছিল এই সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। কিন্তু ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন প্রত্যাশিত কাজে আসছে না।
লালমনিরহাট এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সেতুটির উদ্বোধন করা হলেও নাজুক সড়কের কারণে প্রথম চার বছর ভারী যান চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। পরে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সব ধরনের যানবাহনের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সদস্যরা ভারী যান চলাচল বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
আন্দোলনের মুখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে সেতুর উত্তর প্রান্তে প্রতিবন্ধক খুঁটি বসিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক মহাসড়কটি পুনর্নির্মাণ করে ভারী যান চলাচলের উপযোগী না করা পর্যন্ত প্রতিবন্ধক বহাল থাকবে। তা না হলে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপে সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে ভারী যান চলাচল বন্ধের প্রায় দেড় বছর পার হলেও সড়কটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সড়ক নির্মাণের পরও কেন বন্ধ ভারী যান চলাচল
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর কার্যালয় জানায়, প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বুড়িরহাট থেকে শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হয়।
দরপত্র অনুযায়ী, কার্পেটিং করা পাকা সড়কটির প্রস্থ ১৮ ফুট। এর দুই পাশে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট ইট বিছানো এবং আরও ৩ ফুট করে দুই পাশে মোট ৬ ফুট মাটি বিছানোসহ সড়কটি প্রশস্ত করা হয়।
নির্মাণের পর ভারত থেকে আমদানি করা পাথরসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ভারী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস চলাচলও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে সড়কের দুই পাশের ইট ও মাটি ধসে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর আবারও ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির প্রভাব ও সিন্ডিকেটের কারণেও সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, সড়কটি ভারী যান চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করছেন।
অতিরিক্ত পথে বাড়ছে পরিবহন খরচ
সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর এলাকায় সংযোগ সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে প্রতিবন্ধক তৈরি করা হয়েছে। ফলে ওই সড়ক দিয়ে বাস বা ট্রাক চলাচল করতে পারছে না।
পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস কোনোরকমে চলাচল করলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসগুলোকে কাকিনা বাজার হয়ে লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ী ও ট্রাক-ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, বুড়িমারী থেকে রংপুরের দূরত্ব মহিপুরের দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ব্যবহার করলে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে লালমনিরহাট শহর হয়ে রংপুরে যেতে পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুরে আসতে একটি ট্রাকের ভাড়া পড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অথচ দ্বিতীয় তিস্তা সেতু দিয়ে এলে ভাড়া পড়ত ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। অতিরিক্ত পথের কারণে ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের প্রায় দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হচ্ছে।
ট্রাকচালক সাকিব বলেন, সড়কটি বন্ধ থাকায় তাদের ভোগান্তি বেড়েছে। সবার দিক বিবেচনা করে সড়কটি খুলে দেওয়া উচিত।
রংপুর নগরীর চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়ী রাজ মাহমুদ বলেন, শতকোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও সেটি ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দ্রুত ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া দরকার।
সেতুটি কি শুধু ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য
রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, তারা আশা করেছিলেন মহিপুর সেতু হলে শ্রমিকদের কষ্ট কমবে। কিন্তু সেতু হওয়ার পরও তারা এর সুবিধা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘সেতুটি কি শুধু পথচারী, ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য করা হয়েছে? ভারী যানবাহন কেন বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই আমাদের স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। জনস্বার্থ ও শ্রমিক-মালিকদের সুবিধার্থে এটি অবিলম্বে খুলে দেওয়া উচিত।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, হাতীবান্ধা-রংপুর রুটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দরিদ্র মানুষ থ্রি-হুইলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাইওয়েতে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা বিকল্প এই রুট ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পথটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তাদের সমস্যা তৈরি করেন। এর আগেও সড়কটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। তখন বাস-ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক ভেঙে যায় এবং ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করা হলে বাস-ট্রাক চলায় আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
এই পরিবহন শ্রমিক নেতার দাবি, বর্তমান অবস্থায় ভারী যান চলাচল শুরু হলে পাঁচ থানার হাজার হাজার রোগী যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ভারী যানবাহন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে এলজিইডি লালমনিরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওছার আলম বলেন, আন্দোলনের পর বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতু বা সড়কের মূল কাঠামোতে কোনো সমস্যা নেই।
ফলে, একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতু ও সংযোগ সড়ক পড়ে রয়েছে ভারী যান চলাচলের বাইরে, অন্যদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্যবাহী যানকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে যে উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ও আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
সূত্র: ইউএনবি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন