প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জীবন আসলে সত্যিই অত্যন্ত নিষ্ঠুর। এটি যেন চিকন রশির উপর হেঁটে যাওয়া। এক পাশে আছে আনন্দ এবং অন্য পাশে আছে বেদনা, এক পাশে রয়েছে সাফল্য এবং অন্য পাশে রয়েছে ব্যর্থতা। জীবন কখনো একপাশে থাকে, আবার কিছুক্ষণ পরে অন্য পাশে হেলে পড়ে। সেলিব্রেটিরা, বিশেষত যারা খেলাধুলার সাথে যুক্ত, তাদের জন্য এই সত্যটা অনেক বেশি নিষ্ঠুর। ধরুন, আপনি যদি কোনো ফাইনাল ম্যাচের টাইব্রেকারের শেষ শটটি নিচ্ছেন। গোল করতে পারলে আপনি হিরো, সবাই আপনাকে মাথায় তুলে নাচবে। আর যদি সেই শট কপালগুণে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দেয়, তখন আপনি হয়ে যাবেন ভিলেন, সেই গোলরক্ষক হবে হিরো। এ যেন পিলো পাসিং খেলা। অথবা ক্রিকেটের শেষ বলে যদি ৫ রান লাগবে এবং আপনি ছক্কা মেরে দলের জয় এনে দেন, তাহলে আপনি হিরো। কিন্তু সেই একই শট যদি সীমানার কাছে দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হয়; আপনি কিন্তু ভিলেন। আপনার চেষ্টা একইরকম ছিল। পার্থক্যটা হয়তো অতি সামান্য। রশির ওপর দিয়ে হাঁটার মত। কখনো এপাশে তো কখনো ওপাশে।
এই সময়ে ফুটবল বিশ্বকাপে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মাঠে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। তিনি যে জীবনে প্রায় হাজার গোল করে দুই দশক ধরে আপনাকে আনন্দ দিয়েছেন, তা ভুলে গেছেন অনেকেই। পরের ম্যাচে যখন রোনালদো চমৎকারভাবে ফিরে এলেন, গোল করলেন এবং দলকে জয়ী করলেন; সবাই অবাক হয়ে ভাবেন, ৪১ বছর বয়সেও তিনি এত ক্ষিপ্রতা পাচ্ছেন কীভাবে?
আপনি যতই ভালো খেলোয়াড় হোন না কেন, কখনো কখনো ভাগ্যের একটু সহায়তা লাগেই। আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি এখন সর্বকালের সেরাদের একজন। অথচ ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর তিনি অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। চারটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পরেও শিরোপার স্বাদ পেতে না পারার গ্লানি তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। তখন মেসি জাতীয় দলের জার্সির ভার বহন করতে না পারার কারণে নিছক এক ক্লাব খেলোয়াড় হিসেবেই দৃষ্টিগোচর ছিলেন। ভাবুন একবার, যদি তিনি দুই মাস পর অবসর ভেঙে ফিরে না আসতেন, তাহলে আমরা কি এমন একজন সর্বজয়া ফুটবলারের দেখা পেতাম? মেসি নয়, ফুটবল বিশ্বকে কপাল ভালো যে তিনি ফিরে এসেছিলেন।
শৈল্পিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ব্রাজিলের নেইমার। কিন্তু বারবার ইনজুরির কারণে তার প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। এবার বিশ্বকাপে এলেও বেশিরভাগ সময় বেঞ্চে বসেই কেটেছিল তার সময়। নরওয়ের বিপক্ষে ৭০ মিনিট পর মাঠে নেমে তিনি দলের বিদায় ঠেকাতে পারেননি। হেক্সা মিশনের অকাল পরিসমাপ্তির পর মাঠে নেইমারের কান্না অনেককে স্পর্শ করেছে। কিন্তু আপনি যদি দলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে ইতিহাসের কাছে আপনার কান্নার কোনো মূল্য নেই।
মানুষ বড় নিষ্ঠুর। একটি মুহূর্তের ব্যর্থতায় পূর্বে অর্জিত সব কিছু ভুলে যায়। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা টেন্ডুলকারের নামও ব্যঙ্গ করে এনডুলকার লেখা হয়েছিল। সাফল্য-ব্যর্থতায় পেন্ডুলামের মতো ঝুলতে থাকা জীবন দেখার সর্বশেষ উদাহরণ ভারতের টি-২০ ফরম্যাটের ওপেনিং ব্যাটসম্যান সঞ্জু স্যামসন।
বিস্তারিত লেখার আগে স্যামসনের সর্বশেষ ৬টি টি-২০ ইনিংসের দিকে নজর দেওয়া যাক। ৫০ বলে অবিচল ৯৭, ৪২ বলে ৮৯, ৪৬ বলে ৮৯, ৪ বলে ৫, ১ বলে ০ এবং ৭ বলে এক রান। প্রথম তিনটি ইনিংস টি-২০ বিশ্বকাপের শেষ তিন ম্যাচে টানা। তৃতীয়টি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতকে ফাইনাল জেতানো। টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। টি-২০ বিশ্বকাপ জয়লাভের পর ভারতের প্রথম সফর ছিল আয়ারল্যান্ডে এবং ইংল্যান্ডে। সঞ্জু স্যামসনের পরের তিনটি ইনিংস আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুই সিরিজ এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচের। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সঞ্জু স্যামসন যে সাফল্যের চূড়া এবং ব্যর্থতার অতল খাদ দেখে ফেললেন, এটি তিনি বিবেচনা করেননি, বেচারা স্যামসন। আসলে স্যামসনই কেন, কারো ঘোর শত্রুও এতটা অভিশাপ দেয়নি নিশ্চয়ই। কিন্তু স্যামসনের কপাল খারাপ, কারণ তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল বৈভব সূর্যবংশী নামের এক বিস্ময়বালক। আইপিএলে ২৩৭ স্ট্রাইক রেটে ৭৭৬ রান করা বৈভবকে বাদ দিয়ে সমালোচনা সামলাতে হচ্ছিল টিম ম্যানেজমেন্টকে।
বৈভবকে দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকে বাদ দিতে হবে। কাকে বাদ দেবেন? উভয়সঙ্কট বুঝি একে বলে। সঞ্জু স্যামসনের সাথে ওপেন করেন যিনি, সেই অভিষেক শর্মা এখন টি-২০ র্যাঙ্কিংয়ে ২ নম্বরে। আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড সিরিজেও তার ব্যাটে রানের জোয়ার। তাই মাত্র তিন ম্যাচের ব্যর্থতার কারণে বৈভবের জন্য জায়গা ছাড়তে হয়েছে স্যামসনকে। স্যামসনকে বাদ দেয়াটা ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের জন্যও ছিল খুব কঠিন। সেই ম্যাচের আগে কোচ গৌতম গম্ভীর দীর্ঘসময় স্যামসনের সাথে কথা বলতে দেখা গেছে। নিশ্চয়ই তিনি দলের অন্যতম সেরা পারফরমারকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো মুখের কথায় কি এ বেদনার ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে?
বৈভবের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কারো কোনো সংশয় নেই। স্যামসনের বাদ পড়াটা অনেককে অবাক করেছে। স্যামসনের বাদ পড়ার খবরটি বিশ্বাস করতে চাইছেন না সাবেক ব্যাটসম্যান সঞ্জয় মাঞ্জরেকার। বৈভবকে দলে দেখে তিনি খুশি। কিন্তু স্যামসনের জায়গায় দেখে তিনি অবাক। 'ভারতের জার্সিতে বৈভবকে দেখা খুবই আনন্দের। তবে স্যামসনের কী হলো! ড্রপড? আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন? আমার মনে হয় এটা ইনজুরি। আশা করি ইনজুরি। নইলে এটা হবে সবচেয়ে অদ্ভুত নির্বাচন। বৈভবকে দলে চাইলে স্যামসনকে তিনে খেলানো যেত।' কিন্তু সমস্যা হলো তিনে যিনি ব্যাট করেন ঈশাণ-কিষাণ, যিনি এখন র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে!
ভারতের আরেক সাবেক ব্যাটসম্যান আম্বতি রাঈডুর প্রতিক্রিয়াও একইরকম। নিজের এক্স একাউন্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, 'আসুন সঞ্জু স্যামসনের কথা একটু ভাবি... বৈভবের অভিষেক দেখে খুবই আনন্দ হচ্ছে এবং এটি অবশ্যই উদযাপনের যোগ্য, তবে আসুন আমরা ভুলে না যাই যে মাত্র ৩টি ম্যাচ আগেই সঞ্জু বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন।' জীবন আসলে এমনই। ক্রুর, নিষ্ঠুর, ক্ষমাহীন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন