প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশালের বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে নেমেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তদন্তের জন্য গঠিত কমিটি নির্বাচন-সংক্রান্ত অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়, দুর্গম কেন্দ্রের অতিরিক্ত বরাদ্দ, দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমোদন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়সহ মোট ১৯ দফা তথ্য ও নথি তলব করেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, সাবেক জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দাখিল করা অভিযোগ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্যই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে সরকারি নথিতে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কথা বলা হয়নি। তদন্ত কমিটি মূলত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঘটেছিল কি না, তা অনুসন্ধানে তথ্য ও নথি সংগ্রহ করছে।
নির্বাচনী বরাদ্দ ও দুর্গম কেন্দ্রের অর্থ ব্যয়ের হিসাব তলব
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য চেয়ে পাঠানো ১৯ দফার প্রথমেই রয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে বরিশাল জেলায় নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন খাতে দেওয়া বরাদ্দের তথ্য।
একই সঙ্গে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত সব এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া অর্থের বিতরণ বিবরণী এবং নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ থেকে সম্মানি ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ ও দুর্গম কেন্দ্রের তালিকা এবং হিজলা, মুলাদী ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পাঠানো দুর্গম কেন্দ্রসংক্রান্ত মূল প্রস্তাবও তলব করেছে তদন্ত কমিটি।
দুর্গম কেন্দ্রের প্রস্তাব সংশোধন করে পাঠানো হয়ে থাকলে তার কারণ, অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদিও চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন থেকে দুর্গম কেন্দ্র বাবদ পাওয়া অতিরিক্ত ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের কপি এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার ইউএনওদের দেওয়া অতিরিক্ত বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণও চাওয়া হয়েছে।
তদন্তে দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার ও ব্যবস্থাপনাও
তদন্তের আওতায় এসেছে বরিশালের ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার, আধুনিকায়ন ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিষয়ও।
এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া কোনো প্রস্তাব, সুপারিশ কিংবা নির্দেশনা থাকলে তার কপি চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া দুর্গাসাগর দীঘি পরিচালনায় বর্তমানে কর্মরত ২২ জন কর্মচারীর নিয়োগপ্রক্রিয়া, বেতন কাঠামো এবং আউটসোর্সিং-সংক্রান্ত চুক্তিপত্রও তদন্ত কমিটি তলব করেছে। একই সঙ্গে দুর্গাসাগর দীঘি ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো নীতিমালা থাকলে সেটিও চাওয়া হয়েছে।
শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমোদনও তদন্তে
বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘বরিশাল শিল্প ও বাণিজ্য মেলা’র অনুমোদনসংক্রান্ত আবেদনপত্র ও অনুমোদনপত্রও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
মেলা বন্ধে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো আদেশ বা নিষেধাজ্ঞার কপি, মেলা আয়োজনের অনুমোদন বাতিলসংক্রান্ত আদেশ এবং মেলা বন্ধের লক্ষ্যে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের আয়োজিত সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণীও চাওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়োগে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনও চেয়েছে তদন্ত কমিটি।
এছাড়া ফ্রন্ট ডেস্ক স্থানান্তরের নির্দেশনা এবং তা বাস্তবায়নে গৃহীত কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও তলব করা হয়েছে।
তদন্তের আওতায় এসেছে জেলা প্রশাসনের অধীন শূন্যপদ ও নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ও। জেলা প্রশাসন, বরিশালের আওতাধীন শূন্যপদের তালিকা ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কপি চাওয়ার পাশাপাশি ৮৩টি পদে নিয়োগে বিলম্বের কারণও জানতে চেয়েছে তদন্ত কমিটি।
জ্বালানি সংকটের সময় তেল বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সৃষ্ট যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ার সময় বরিশালে বিপুল পরিমাণ অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের দায়িত্ব পালনের সময় আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আলোর লাইসেন্সের অনুকূলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সে সময় বিষয়টি নিয়ে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল তালাশ বিডি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে আলাউদ্দিন আলোকে বরিশালের একজন আলোচিত-সমালোচিত তেল ব্যবসায়ী, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং ট্যাংক লরি মালিক সমিতির কথিত সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত এবং তার পূর্বসূরি সাদিক আবদুল্লাহ—উভয় মেয়রের সময়ই নিজের প্রভাব বজায় রেখেছিলেন।
তার বিরুদ্ধে সাবেক মেয়রের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন তেল কেলেঙ্কারি, অবৈধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং জেলা প্রশাসকের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগে গভীর তদন্তের দাবি
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির বরিশাল বিভাগীয় সভাপতি রনি সিকদার অভিযোগ করে বলেন, দেশের জ্বালানি সংকটের সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমন ও আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আলোর বিরুদ্ধে তেল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনৈতিক বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
তিনি এ বিষয়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি জানান।
রনি সিকদার বলেন, অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে খায়রুল আলম সুমন, আলাউদ্দিন আলোসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে দেশের কোনো সংকটময় পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট সরকারি ব্যবস্থাপনাকে ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ নিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আলাউদ্দিন আলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ কি তদন্তের বাইরে?
তবে তেল বরাদ্দসংক্রান্ত অভিযোগটি বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তদন্তের ১৯ দফা বিষয়বস্তুর মধ্যে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে—সাবেক জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের দায়িত্ব পালনকালীন প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে যখন একের পর এক অভিযোগ তদন্তের আওতায় এসেছে, তখন জ্বালানি সংকটের সময় আলোচিত তেল বরাদ্দ এবং কথিত তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগে আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আলোর ভূমিকা কি তদন্তের বাইরে থেকে যাবে?
একসঙ্গে ১৯ দফা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি তলব এবং পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির দুই সদস্যের বরিশালে এসে বর্তমান জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ঘটনায় প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে নির্বাচন-সংক্রান্ত অর্থ ব্যয়, দুর্গম কেন্দ্রের অতিরিক্ত বরাদ্দ, দুর্গাসাগর দীঘির সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য মেলার অনুমোদন, ফ্রন্ট ডেস্ক স্থানান্তর, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ৮৩টি পদে নিয়োগে বিলম্ব—এমন একাধিক পৃথক বিষয় একই তদন্তের আওতায় আসায় তদন্তের ব্যাপ্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
এখন তদন্ত কমিটির তলব করা নথি, বরিশালে সরেজমিনে নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকদের বক্তব্য, লিখিত, ভিডিও ও মৌখিক বয়ান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর সাবেক জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বাস্তবতা কতটুকু এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঘটেছিল কি না—তা তদন্ত প্রতিবেদনে কীভাবে উঠে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের সময় বরিশালে আলোচিত তেল বরাদ্দ এবং কথিত তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগ তদন্তের আওতায় আসে কি না, সে প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি.
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন