প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সমুদ্রে জাহাজের চাকরিতে মাসিক আয় ১৫ লাখ টাকার বেশি। কিন্তু মেরিন একাডেমিতে শিক্ষকতা করলে বেতন হয় ১ লাখ টাকারও কম! এই আকাশ-পাতাল ব্যবধানের কারণেই দেশের প্রথম সারির মেরিটাইম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। বারবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা সত্ত্বেও যোগ্য শিক্ষক মিলছে না। অভিজ্ঞ শিক্ষকরাও একে একে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যাচ্ছেন। ফলে মান বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে একাডেমিটি।
দেশের সাধারণ চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে লাখো তরুণের ভিড় থাকলেও মেরিন একাডেমির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর প্রধান কারণ হলো, সাধারণ কোনো ডিগ্রিতে এই একাডেমির শিক্ষক হওয়া সম্ভব নয়। এখানে শিক্ষকতা করতে হলে মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ারের মতো প্রফেশনাল ডিগ্রি প্রয়োজন, এবং সমুদ্রগামী জাহাজে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক। যারা এই ডিগ্রি অর্জন করেন, তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারা ডলারে বেতন পান। তাই উচ্চশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ মেরিনাররা মেরিন একাডেমির চাকরি ছেড়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি আগামীর খবরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানিয়েছেন, একজন মেরিন ক্যাডেটের পড়ালেখার পেছনে সরকার তিন বছরে কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। চাকরির শুরুতেই তাদের মাসিক বেতন ৫ লাখ টাকার বেশি হয়ে থাকে।
আনাম চৌধুরীর উদ্বেগ, যদি দ্রুত এই শিক্ষক সংকটের সমাধান না হয়, তাহলে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি বড় ঝুঁকিতে পড়বে। প্রথমত, শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যাবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) ‘হোয়াইটলিস্ট’ বা বৈশ্বিক স্বীকৃতি থেকে বাদ পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০১২ সালে ফিলিপাইন এমন বিপদে পড়েছিল। তাদের পুনরুদ্ধারে ৯ বছর লেগেছিল। হোয়াইটলিস্ট থেকে বাদ পড়লে এই একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেটদের বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ থাকবে না।
চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমির জনবল কাঠামোয় প্রফেশনাল শিক্ষক পদ রয়েছে ২০টি। কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র অর্ধেক। শূন্য পদে বারবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সত্ত্বেও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২৩ সালের বিজ্ঞপ্তিতেও কোনো সাড়া মেলেনি। হাতে গোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের ওপরেই সব ক্লাসের চাপ পড়ছে। ফলে ক্যাডেটদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে।
মেরিন একাডেমি অ্যালামনাই সদস্যরা জানাচ্ছেন, সামনে আইএমও অডিট টিম আসার আগে যদি শিক্ষক সংকটের সমাধান না হয়, তাহলে বাংলাদেশ বড় বিপদের সম্মুখীন হবে।
শিক্ষক না পাওয়ার মূল কারণ অত্যন্ত সরল। একজন মাস্টার মেরিনার বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার যখন কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরি করেন, তখন তার মাসিক বেতন ১৫ লাখ টাকার বেশি (১২ থেকে ১৫ হাজার ডলার)। কিন্তু মেরিন একাডেমিতে যোগ দিলে সরকারি স্কেলে তার বেতন লাখ টাকার অনেক নিচে। মাসে ১৫ লাখ টাকার সমুদ্রে জাহাজের বিলাসবহুল চাকরি ছেড়ে দেশের একাডেমিতে পড়াতে আসতে চান না মেরিনাররা।
নতুনরা আসছেন না, তার উপর যারা আগে যোগ দিয়েছিলেন, তারাও টিকছেন না। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক একাডেমি ছেড়ে চলে গেছেন। বিশাল বেতন নিয়ে তারা আবার জাহাজে ফিরে গেছেন অথবা বিদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে বিপুল বেতনে যোগ দিয়েছেন।
তাদের মধ্যে একজন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুল মান্নান। তিনি ২০২২ সালে টিউটর হিসেবে চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে চাকরি শুরু করেছিলেন। এক বছর চাকরির পর কাঙ্ক্ষিত বেতন-ভাতা না পেয়ে চাকরি ছেড়ে লন্ডন চলে যান। তিনি জানান, চট্টগ্রামের ছেলে হিসেবে শিক্ষকতায় থাকতে চেয়েছিলেন। নির্ধারিত বেতন-ভাতা না পেয়ে এক বছর নিজের সঞ্চয় ভেঙে শিক্ষকতা করেছেন। হতাশ হয়ে তিনি দেশ ছেড়েছেন। আবেগ দিয়ে তো পেট চলে না। এখন তিনি লন্ডনের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির ফ্লিটউড নটিক্যাল কলেজে সিনিয়র টিউটর হিসেবে শিক্ষকতা করছেন। তার বেতন মাসে ৪ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা)। এর বাইরে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তিনি পরিবারসহ সেখানে বসবাস করছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—২০০২ সালের আগ পর্যন্ত শিক্ষকরা কিভাবে কাজ করতেন? তখন একাডেমির শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা বা আকর্ষণীয় ‘মেরিন অ্যালাউন্স’ চালু ছিল। ব্রিটিশ বা আইএমওর বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে তারা আন্তর্জাতিক স্কেলে বা তার কাছাকাছি সম্মানজনক বেতন পেতেন। বেতনের পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও অন্যান্য সুবিধা এতই চমৎকার ছিল যে, জাহাজের বেতনের কিছুটা কম হলেও অভিজ্ঞ মেরিনাররা হাসিমুখে শিক্ষকতা পেশায় আসতেন।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস একটি চিঠির মাধ্যমে এই বিশেষ ভাতা প্রদান বন্ধ করে দিলে সংকট শুরু হয়। এরপর শিক্ষকরা একে একে একাডেমি ছাড়তে থাকেন। মেরিন একাডেমি ও অ্যালামনাইরা অনেক চেষ্টা করেও বিশেষ ভাতা পুনরায় চালু করতে পারেননি। এরপর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। সেই মামলা এখনো ঝুলে আছে।
মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এ বি এম শামীম বলেন, ‘ইনস্ট্রাকটর নিয়োগের একাধিক বোর্ডে আমি দেখেছি, চার পদের বিপরীতে মাত্র একজন ইন্টারভিউ দিয়েছেন। সেই একমাত্র প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করলেও বেতন কাঠামো বাড়ানোর আশা না পেয়ে তিনি যোগ দেননি। এভাবে চলতে থাকলে তো একাডেমির আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সবাই মিলে বিপদে পড়ব।’
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার (আইএমও) বাধ্যবাধকতা এবং দেশীয় আইন অনুযায়ী, মেরিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ শুধুমাত্র দক্ষ ও সনদপ্রাপ্ত মেরিন পেশাদারদের দ্বারাই পরিচালনা করা আবশ্যক। আইএমও নিয়মিতভাবে একাডেমিগুলোর মান নিরীক্ষা করে থাকে। ফলে যোগ্য শিক্ষক না থাকলে একাডেমি ও মেরিনাররা ঝুঁকিতে পড়বেন। মেরিন একাডেমির শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ বেতন কাঠামো (স্পেশাল পে স্কেল) তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন মেরিনাররা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন