প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ : এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। আর্জেন্টিনায় দেখা দিয়েছে বন্যা, পেরুতে প্রাণঘাতী দাবানল এবং ফরাসি গায়ানায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চলতি বছরে এল নিনোর নজিরবিহীন ধ্বংসাত্মক প্রভাব মোকাবিলার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের পানির উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাসের প্রবাহ, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটে।
সাধারণত এল নিনো প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর ঘটে এবং এর প্রভাব প্রায় ৯ মাস থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়।
চলতি বছরে এই প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনার কারণে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রধান সেলেস্তে সাউলো মন্তব্য করেছেন, বর্তমান এল নিনোর তীব্রতা নজিরবিহীন হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান এল নিনো এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে গত চার দশক ধরে এটি পর্যবেক্ষণে আমরা যেসব মানদণ্ড ব্যবহার করে আসছি, তার সীমাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’
সাউলো এবং জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার যৌথভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব জনগণের অনেকেই আগে থেকেই চরম সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন।
সাউলো বলেন, ‘আমরা এল নিনোকে থামাতে পারব না। তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক পরিণতির অনেকগুলোই প্রতিরোধ করতে পারব।’
টম ফ্লেচার এল নিনোকে একটি ‘ধ্বংসাত্মক গোলার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার আশঙ্কা, এর প্রভাবে লাতিন আমেরিকা, পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা, এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিটা হলো, এর ফলে কোটি কোটি মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়তে পারেন।’ এল নিনোর প্রভাবে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আরও তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পর্যটন শহর পাসো দে লা পাত্রিয়ার বাসিন্দা হুয়ান পাবলো গোমেজ এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘এক দিনের ব্যবধানেই হঠাৎ আমার বাড়িতে এক মিটার উঁচু পানি ঢুকে পড়ে।’
এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত বন্যায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরের কয়েকটি এলাকায় বাড়িঘরের ছাদ ছাড়া আর কিছুই পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পারানা, উরুগুয়ে এবং ইগুয়াজু নদীর পানি বেড়ে যায়। এর ফলে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
এই তিনটি নদী যথাক্রমে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে এবং উরুগুয়ের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
পেরুতে ভয়াবহ দাবানলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিমার সায়েন্টিফিক ইউনিভার্সিটি অব দ্য সাউথের জীববিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড্যানিয়েল ভালে এএফপিকে জানিয়েছেন, ‘এল নিনোর কারণে পুরো পেরুর ওপর প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক বায়ুর একটি বিশাল স্তর তৈরি হয়েছে।’
তিনি জানান, এই আবহাওয়াগত ঘটনার কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং পরিবেশ শুষ্ক হয়ে পড়ায় দাবানলের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
কর্তৃপক্ষ গত সপ্তাহে জানিয়েছে, জুন থেকে দেশটিতে বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুনে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দাবানলে শত শত মানুষ দুর্যোগের শিকার হয়েছেন।
নিহতদের অধিকাংশই কৃষক। নিজেরাই আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁরা মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন এবং ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।
ফরাসি গায়ানায় কয়েক মাস ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় ফ্রান্সের এই সমুদ্রপারের ভূখণ্ডের নদীপথে নৌযান চলাচল ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে।
সড়ক যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোর প্রায় ৪০ হাজার বাসিন্দার কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে কর্তৃপক্ষ আকাশপথে সরবরাহব্যবস্থা চালু করেছে। এর লক্ষ্য হলো, এসব এলাকার মানুষের কাছে সহনীয় দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা সচল রাখা এবং উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা চালু রাখা।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে আগামী তিন মাসে সোমালিয়ার প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে পারেন।
গত সপ্তাহে সংস্থাটি সতর্ক করে জানায়, এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোমালিয়ায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ১ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের মধ্যে সংস্থাটি এখন পর্যন্ত মাত্র ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ পেয়েছে।
এদিকে, কলম্বিয়ায় টানা চার মাস ধরে মাসভিত্তিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার তথ্য বিশ্লেষণ করে এএফপি জানিয়েছে, জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়াগত ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে থাকায় কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য সরাসরি এল নিনোকে দায়ী করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) পদার্থবিদ মিশেল ল্যুরো এএফপিকে বলেন, এল নিনোর সঙ্গে বিভিন্ন আবহাওয়াগত ঘটনাকে একটি মহাসড়কের যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
তিনি বলেন, ‘এল নিনো কোনো নির্দিষ্ট যানবাহনের গতি কত হবে বা সেটি কোন লেনে চলবে, তা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। কখনো কখনো যানবাহন হঠাৎ মহাসড়ক থেকে বেরিয়ে যায় কিংবা নতুন যানবাহন সেখানে প্রবেশ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একইভাবে, এল নিনো ছাড়াও অন্যান্য কারণ আবহাওয়াগত ঘটনাগুলোর নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে।’ ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের (সিএনআরএস) গবেষণা পরিচালক দাভিদে ফারান্দা বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য সরাসরি এল নিনোকে দায়ী করা সঠিক নয়। কারণ, অঞ্চল ও মৌসুমভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হয়। এ ছাড়া জলবায়ুর স্বাভাবিক ওঠানামা ও অন্যান্য আবহাওয়াগত বিষয়ও এর ওপর প্রভাব ফেলে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন