১১:০১ পি.এম
খাদ্য ও সংগীতের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘকালীন। মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে এ দুটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত। পছন্দের গান যেমন মনকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়, তেমনই বিশেষ খাবারের স্বাদ ফিরিয়ে আনে আপনজনের কথা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি। প্রাচীনকাল থেকে নানা উৎসব ও পার্বণে খাবারের আয়োজনের সঙ্গে বসে গান গাওয়ার আসরও হয়ে আসছে। আধুনিক যুগে ইউরোপ ও আমেরিকায় বিভিন্ন মিউজিক্যাল ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। খাদ্য ও সংগীতের মিশ্রণে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে একটি অনন্য আয়োজন দেখা গেল রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে। এখানে অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণের সঙ্গে সংগীতের সুরও উপভোগ করেন।
আজ শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর ৩০০ ফুট সড়কে যানবাহনের ব্যস্ততা, হর্নের শব্দ এবং মানুষের ছুটে চলার মধ্যে প্রবেশ করতেই বদলে গেল চারপাশের আবহ। মৃদু স্বরে রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসছিল। স্নিগ্ধ আলো, খাবারের সুবাস এবং সংগীতের মূর্ছনা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন পরিবেশ। প্রতিটি টেবিলে সাজানো ছিল নানা পদের খাবার। পাশের মঞ্চে লাইভ মিউজিক পরিবেশনা চলছিল। অতিথিদের মধ্যে কেউ পরিবার নিয়ে এসেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ একা। তারা ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে বসে খাবার ও গানের আনন্দ উপভোগ করতে এখানে এসেছেন। খাবারের স্বাদ নেওয়ার ফাঁকে তারা শুনছিলেন চমৎকার সব পরিবেশনা।
আজ হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে আয়োজিত হয়েছিল ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’। এই অনুষ্ঠান রাত ৮টায় শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলেছিল। এবারের সংগীত পর্বটি রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে সাজানো হয়েছিল। একদিকে কবিগুরুর গানের আবেশ, অন্যদিকে মোগল রন্ধনশৈলীতে তৈরি নানা পদের খাবার—দুইয়ে মিলে অতিথিদের জন্য তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
আরও পড়ুন: বসের পক্ষ থেকে অফিসের সব নারী কর্মীকে আইফোন উপহার
রাত ৮টায় মঞ্চে ওঠেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ছন্দা রায়। তিনি সংগীতশিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পী উভয়ই। মৃদু আলোয় তিনি শুরুতেই পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘আগুনের পরশমণি’। আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের জাগরণের আকাঙ্ক্ষায় ভরা এ গান যেন মুহূর্তেই পরিবেশে ছড়িয়ে দেয় এক গভীর আবেশ। এরপর তার কণ্ঠে শোনা যায় ‘তুমি রবে নীরবে’। প্রেম ও নিবিড় ভালোবাসার অনুভূতিতে পূর্ণ গানটি শ্রোতাদের নিয়ে যায় একান্ত আবেগের জগতে। এরপর ছন্দা রায় পরিবেশন করেন ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। পুরনো বন্ধুত্ব, স্মৃতি এবং হারানো দিনের মায়া জড়ানো এ গান অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে ফেলে আসা দিনের কথা। একে একে তিনি শোনান ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ এবং ‘দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে’। পরিচিত গানগুলোর সুর অতিথিরা কখনো মগ্ন হয়ে শোনেন, আবার কখনো গানের সঙ্গে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন।
বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রসংগীতের আবেদন বহুমাত্রিক। কখনো প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, কখনো প্রেম-বিরহ, কখনো গভীর উপলব্ধি—জীবনের নানা অনুভূতি মূর্ত হয়ে ওঠে কবিগুরুর গানে। গানের আবহে খাবার উপভোগের অভিজ্ঞতাও পায় বাড়তি মাত্রা। সংগীতের সুর এবং খাবারের স্বাদ মিলেমিশে তৈরি করে উপভোগের এক ভিন্ন জগৎ।
হেরিটেজ রেস্টুরেন্টের আরেকটি আকর্ষণ হলো মোগল খাবার। ঐতিহ্যবাহী রেসিপি ও রন্ধনশৈলীতে তৈরি এসব খাবারের স্বাদে রয়েছে ইতিহাসের ছোঁয়া। খাবার পরিবেশনেও বিশেষত্ব রাখা হয়েছে। মোগল পোশাকে পরিবেশনকর্মীরা অতিথিদের সামনে তুলে ধরছেন নানা পদ। ফলে শুধু খাবারের স্বাদ নয়, পরিবেশনার মধ্য দিয়েও ফুটে উঠছে ঐতিহাসিক আবহ। রেস্টুরেন্টের সাজসজ্জা ও পরিবেশ—সব মিলিয়ে অতিথিদের সামনে তুলে ধরে রাজকীয় ভোজের এক অনুষঙ্গ।
আয়োজকদের ভাষ্য, মোগল খাবারের সঙ্গে আমাদের অঞ্চলের খাদ্য সংস্কৃতির রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক। সময়ের পরিবর্তনে রন্ধনপ্রণালী ও স্বাদে নানা সংযোজন-বিয়োজন ঘটলেও মোগল রন্ধনশৈলীর প্রভাব এখনো খাবারে দৃশ্যমান। খাদ্য সংস্কৃতির ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি খাবারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংগীতকে যুক্ত করাই তাদের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘গ্র্যান্ড মিউজিক্যাল নাইট’-এর বিশেষত্ব এখানেই।
আরও পড়ুন: পর্যটন কন্টেন্ট তৈরির জন্য সম্মাননা পেলেন ইমন
প্রতি শুক্রবার থাকছে একেক ধারার সংগীত আয়োজন। অর্থাৎ প্রতিটি পর্বে সংগীতের ভিন্ন ভিন্ন ধারা থাকবে। ফলে একই জায়গায় বারবার এসেও অতিথিরা নতুন অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। রবীন্দ্রসংগীতের স্নিগ্ধতা থেকে হিন্দি গানের নস্টালজিয়া, নজরুলগীতির উদ্দীপনা কিংবা লোকসংগীতের মাটির ঘ্রাণ—প্রতিটি পরিবেশনার সঙ্গে বদলে যাবে সন্ধ্যার আবহ।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। পরবর্তী পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ১৩ নভেম্বর। সেদিন পরিবেশিত হবে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় হিন্দি গান। এরপর ২০ নভেম্বর নজরুলগীতি, ২৭ নভেম্বর কালজয়ী বাংলা গান, ৪ ডিসেম্বর পিয়ানো ও কণ্ঠসংগীত, ১১ ডিসেম্বর শাস্ত্রীয় যন্ত্রসংগীত এবং ১৮ ডিসেম্বর লোকসংগীত পরিবেশন করবেন শিল্পীরা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন