প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছে লোহিত সাগরে নতুন করে শুরু হওয়া উত্তেজনা।এই অঞ্চলে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা।বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই অবরোধের ফলে আরেক দফা প্রভাব পড়তে পারে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে, ইরান বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এই ফ্রন্টে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি পুরনো সংঘাত নতুন করে উজ্জীবিত করতে যাচ্ছে?
গত সোমবার হুথিরা ঘোষণা দেয়, তারা কোনো জাহাজকে সৌদি আরবের বন্দরে পণ্য ওঠানো বা নামানোর অনুমতি দেবে না।
এই হুমকি কার্যকর হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই প্রণালির মাধ্যমে সাধারণত বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন হয়। অন্যদিকে সৌদি আরবের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ বর্তমানে লোহিত সাগরপথের এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে।
হুথিদের এই ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিষয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিক সামরিক সহায়তা চায়নি সৌদি আরব।
নতুন কৌশলে কোন পথে যাচ্ছে যুদ্ধ?
এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, হুথিরা যদি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘এ ধরনের কিছু ঘটলে আমরা সেটি মোকাবিলা করব। এর আগেও আমরা হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি বাস্তবে এতটা সহজ নয়।
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন আরেকটি সামরিক ফ্রন্টে জড়াতে হতে পারে।
বহু বছর ধরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার মুখেও হুথিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ফলে তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইতোমধ্যে ইরানকে ঘিরে পরিচালিত সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সম্পদ ভাগ করে ব্যবহার করতে হবে।
এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজের একটি অংশ ইয়েমেন উপকূলের দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
তাহলে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হবে।হুথিদের পুরনো পদক্ষেপে ট্রাম্পের নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুথিদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ট্রাম্প শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে দ্রুত তেহরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনার আশা করেছিলেন। কিন্তু সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। সতর্ক করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করতে হবে। এতে ইতোমধ্যেই চাপের মুখে থাকা মার্কিন অস্ত্রভান্ডার আরও সংকুচিত হতে পারে। হুথিদর সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সাবেক মার্কিন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইকেল মুলরয় রয়টার্সকে জানান, অতীতেও তারা একাধিকবার প্রমাণ করেছে যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা এবং ইচ্ছা—দুটিই তাদের রয়েছে। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সময় লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপথ সচল রাখতে হুথিদের অবস্থানে একাধিক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনও ইয়েমেন উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে সেই অভিযান আরও জোরদার করে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযানের পরও হুথিদের নৌপথে হামলার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বরং গত বছরের দুই মাসব্যাপী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি বিমানবাহী রণতরী, একাধিক যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং বি-২ কৌশলগত বোমারু বিমান মোতায়েন করতে হয়েছিল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ২০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংবাদের মোকাবিলায় আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম অঞ্চলটিতে পাঠানো হচ্ছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে ইয়েমেনকেন্দ্রিক নতুন সংঘাত শুরু হলে প্রয়োজনীয় নৌ ও আকাশ শক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামরিক সম্পদ বণ্টন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি চ্যালেঞ্জ হলেও হুথিরাও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ ইরানের ওপর চলমান অবরোধের কারণে তাদের প্রধান সমর্থক থেকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শতভাগ কার্যকর না হলেও যথেষ্ট কার্যকর। ফলে হুথিদের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে এমন অভিযান চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন