প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানুষকে তিনি সামাজিক ইউরেনিয়াম হিসেবে দেখেন। ইউরেনিয়ামের মতো, যা প্রচণ্ড শক্তির সম্ভাবনা বহন করে, মানুষও অসীম সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তবে, সেই সম্ভাবনার গতি নির্ধারিত হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, নেতৃত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান এবং চারপাশের মানুষের আচরণের মাধ্যমে, যা তাকে ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ ও গঠন করে। ডিজিটাল জগতে সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সাররা সেই সামাজিক ইউরেনিয়ামকে এনরিচ করেন অথবা অপতথ্য দিয়ে ধ্বংস করেন। মিডিয়া একটি সমাজে জ্ঞান, সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের শক্তি বৃদ্ধি করে, আবার মিডিয়ার অপব্যবহারে দেশে হিংসা, দুর্নীতি, প্রতিশোধ, অপরাধ কিংবা ধ্বংসের সূচনা ঘটে। তাই রাষ্ট্রের উন্নয়নে প্রজ্ঞাবান মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের উচিত একক মানুষ নয় বরং দেখতে হবে কোন কোন সামাজিক ফল্ট লাইন সক্রিয় এবং সেগুলি কীভাবে রোধ করা যায়।
এই কারণে তিনি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে লেখেন না। কিন্তু কখনও কখনও কোনো একজন মানুষের সিদ্ধান্ত এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যার প্রভাব ব্যক্তি অতিক্রম করে একটি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং একটি প্রজন্মের ওপর পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন তিনি ঠিক সেই জায়গা থেকেই অনুভব করেন। এটি কোনো ব্যক্তিপূজা নয়। বরং একটি সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার প্রজ্ঞা কীভাবে একটি সম্ভাব্য ভয়ঙ্কর সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল, তার একটি ঐতিহাসিক পাঠ।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ২৩ জুন ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান। কিন্তু যখন তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দিকে এগোচ্ছিল, যার গভীরতা তখনও সম্পূর্ণরূপে অনুমান করা সম্ভব ছিল না।
জুলাই ২০২৪-এর শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ২০১৮ সালে বাতিল করা কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের পর শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামে। শুরুতে এটি একটি ছাত্র আন্দোলন হলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তা দ্রুত বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে আন্দোলন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য শ্রেণির মানুষের সমর্থনও যুক্ত হতে থাকে, ফলে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। ১৮ জুলাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশনের সদর দপ্তরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৯ জুলাই নরসিংদীর একটি কারাগারে হামলা চালিয়ে ৮৫০-এর বেশি বন্দিকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং কারাগারে আগুন দেওয়া হয়। একই রাতে সরকার দেশব্যাপী কারফিউ ঘোষণা করে এবং সেনাবাহিনীকে মাঠে মোতায়েন করে।
সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়গুলোর একটি ছিল ১৮ থেকে ২১ জুলাই। ২১ জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ১৩৯ জন নিহত হয়। একই সময়ে সরকার দেশব্যাপী ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে সংবাদ, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২৫ জুলাই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক জানান, সে সময় পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদনে ১৭০ জনের বেশি নিহত এবং এক হাজারের বেশি আহত হয়েছিল। তিনি নির্বিচারে গ্রেপ্তার, আহতদের চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ এবং ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আন্দোলন সাময়িকভাবে কিছুটা স্তিমিত হলেও সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। ১ ও ২ আগস্ট আবার বিক্ষোভ শুরু হয়। ৩ আগস্ট ছাত্রনেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেন। এরপর আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের আন্দোলন থাকেনি; এটি সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়। দেশজুড়ে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৯১ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে অনেক পুলিশ সদস্য ছিলেন।
এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে একাকি সিদ্ধান্ত না নিয়ে ৩ আগস্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনীর সকল অফিসারদের সাথে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী কথা বলেন, বুঝলেন তার প্রিয় সেনাবাহিনী আসলে কি ভাবছে, তারপর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন সকলের উদ্দেশ্যে, বললেন, ‘সেনাবাহিনী জনগণের ওপর কোনোভাবেই গুলি চালাবে না’। তার এই স্পষ্ট বক্তব্য অচিরেই আন্দোলনকারীদের কাছে পৌঁছে গেলে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা এবং আপামর সেনাসদস্যগণ যেন বুকের উপর চেপে থাকা এক পাথর মুক্তির আনন্দ অনুভব করেন।
৪ আগস্টের রাতটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় রাতগুলোর একটি। পরিস্থিতি ক্রমেই এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছিল যেখানে সেনাবাহিনীকে বারবার শক্তি প্রয়োগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই রাতে গণভবনে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং সব বাহিনীর প্রধানগণের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, কেন জনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা অন্যায়।
এরপর ৫ আগস্ট ২০২৪ সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে শেখ হাসিনা তাকে আবার গণভবনে ডেকে পাঠান। সেখানে যা হয়েছিল তা আমরা আজও স্পষ্টভাবে জানি না, হয়তো ভবিষ্যতে কেউ ইতিহাস লেখার সময় সেই সত্য তুলে ধরবেন; তবে আমার অনুমান ও কল্পনা থেকে নিচের অংশটি লিখলাম:
“জেনারেল ওয়াকার গণভবনে ঢুকছেন। চারপাশে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বাহিনীতে নিযুক্ত তার বিশ্বস্ত সেনাসদস্যরা লোড করা অস্ত্র নিয়ে কারো আঙুলের ইশারার দিকে তাকিয়ে। যে সেনাদের তিনি অন্তর থেকে ভালোবাসেন, দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যাদেরকে তিনি গড়েছেন, গণভবনে দায়িত্ব পালনরত সেই সেনাদেরই যেন তিনি চিনতে পারছেন না, বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি ধীর পদে এগিয়ে চলেছেন মিটিং কক্ষের দিকে। তিনি জানেন, শেখ হাসিনার সামনে এই মুহূর্তে দুটি স্পষ্ট অপশন—আমাকে বন্দি করে অথবা হত্যা করে এখান থেকেই অন্য কাউকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করে নতুন সেনাপ্রধানকে দিয়ে জনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ; অথবা অনুরোধ মেনে দেশত্যাগ করা। তিনি স্পষ্টই শেখ হাসিনার মানসিকতা জানতেন, তাই প্রথম অপশনের জন্য প্রস্তুত হয়েই আজ এসেছেন। অস্ফুট কণ্ঠে গণভবনের একজন নিরাপত্তা অফিসারকে বললেন, ‘তোমরা আমাকে হত্যা করতে পারো, তবে সেটা কোনো উপকার বয়ে আনবে না। আন্দোলন এখন যে পর্যায়ে চলে গেছে তা কোনোভাবেই তোমরা নেভাতে পারবে না। দেশ পুরো ছারখার হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীসহ গণভবনের কেউই বাঁচতে পারবে না।’ গণভবনের নিরাপত্তা অফিসার কিছু একটা ভাবলেন, মনে হয় তিনি কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিজের মনেই বদল করলেন।
জেনারেল ওয়াকার ঢুকলেন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে, বুঝিয়ে বললেন; কিন্তু শেখের কন্যা অনড়। তিনি দেশ ছাড়বেন না, এবং যে কোনো মূল্যে আন্দোলন দমন করবেন। জেনারেল ওয়াকারকে শোনালেন শত শত জঘন্য বিষবাক্য। উপায়ান্তর না পেয়ে, জেনারেল ফোনে কথা বললেন শেখ হাসিনার পুত্র ও কন্যাদের সাথে, তাদের মাকে বুঝিয়ে বলার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু সেখানেও তিনি মর্মাহত বাক্যবানে নিষ্পেষিত হলেন, তবুও গভীর প্রজ্ঞায় মাথা ঠান্ডা রেখে বুঝিয়ে দিলেন কেন ৩০ মিনিটের মধ্যে দেশত্যাগ না করলে গণভবন রক্তবন্যায় ভেসে যাবে। এবার মায়ের সাথে কথা বলে মাকে দেশত্যাগে রাজি করালেন জয়। ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানারা দেশত্যাগ করলেন।
৫ আগস্ট দুপুর থেকেই তৈরি হলো দেশজুড়ে এক ভয়াবহ নেতৃত্বশূন্যতা। এমন কেউ নেই যে জাতিকে পথ দেখাবে, কেউ নেই যে হাল ধরবে। চারদিকে ডাকাতি শুরু হলো, পুষে রাখা ক্ষোভ মেটাতে ভাঙচুর আর দখল শুরু হয়ে গেল নানা স্থানে। চরম নৈরাজ্যের মাঝে দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ যেন চাইছে সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করুক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর প্রধান কর্তৃক রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের নজির রয়েছে। ১৯৭৫ এবং ১৯৮২ সালের অভিজ্ঞতা এবং ২০০৭ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দুই তিন দশক আগে কেউ কেউ জনগণের সমর্থন ছাড়াই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চেষ্টা হয়ত করেছিল কিন্তু এবার অবস্থা সম্পূর্ণ সেনাপ্রধানের পক্ষে, রাষ্ট্র যেন নিজেই চাইছে তার শাসন, কিন্তু জেনারেল ওয়াকার রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিলেন না। রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করলেন, দফায় দফায় জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেন, ছাত্র ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। সেনাদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেন, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন; আর যেন কোন মব না হয়, আর যেন কোন প্রাণ ঝরে না যায় সে জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করলেন। তিনি একটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া রাজনৈতিক পরিবেশে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সেতুর ভূমিকা পালন করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে দিলেন।
৫ আগস্ট ২০২৪: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর সামনে আর কী কী বিকল্প খোলা ছিল?
১. প্রথম বিকল্প: সাংবিধানিক দায়িত্ব মেনে তিনি সরকারের আদেশ পালন করার জন্য সেনাবাহিনীকে যে কোনো মূল্যে আন্দোলন দমানোর আদেশ দিতে পারতেন।
সম্ভাব্য ফলাফল: সেনারা বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার জন্য শক্তি ব্যবহার করত, হয়তো এক সময় তারা গুলি চালাতে বাধ্য হতো। একটি গুলি থেকে জন্ম নিত আরও গোলাগুলি। জনতার সাথে সেনাদের সংঘর্ষ বাড়তে বাড়তে সেনাবাহিনী বনাম জনগণ এই ভাবে বিভক্ত হয়ে যেত দেশ। কয়েকদিনের মাঝেই সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার বদলে মিশে যেত জনতারই পক্ষে। শুরু হতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের আক্রমণ। আগুনে ঘি দিতে সুযোগ নিত শত্রু প্রতিবেশী। ২০২৪ আর ২০২৫ জুড়ে চারিদিকে শুধু হত্যা, রক্ত, আগুন, আর ধ্বংসের মাঝে আজ ২০২৬ সালের অক্টোবরে বংগভুমিকে দেখা যেত পোড়ামাটির ধ্বংসস্তূপ; জনসংখ্যা হয়তো আপনাতেই অনেক কমে যেত। আর জলপাই উর্দি পরা সেনারা আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে মিশন করত আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতে।
২. দ্বিতীয় বিকল্প: সেই সময়ের সরকার পক্ষকে তুষ্ট রাখতে ডিপ্লোম্যাসি করে জেনারেল ওয়াকার যদি একথা স্পষ্টভাবে না বলতেন যে, ‘সেনাবাহিনী জনগণের ওপর কোনোভাবেই গুলি চালাবে না’।
সম্ভাব্য ফলাফল: আন্দোলনরত জনতা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ত। সেনাদের সাথে অবিশ্বাস বাড়ত, সেই অবিশ্বাস থেকেই মারামারি হত। গোলাগুলি বৃদ্ধি পেতে পেতে প্রথম বিকল্পের একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
৩. তৃতীয় বিকল্প: ঝামেলা এড়াতে জেনারেল ওয়াকার যদি নিজে থেকেই পদত্যাগ করতেন।
সম্ভাব্য ফলাফল: এমন হলেও প্রথম বিকল্পের পরিস্থিতি ঘটার আশঙ্কাই সবচেয়ে বেশি ছিল কারণ সেই সময় লেঃ জেনারেল পদে যারা সরকারের প্রিয়পাত্র ছিলেন তারা যে সরকারের অন্ধ ভক্ত তার অনেক প্রমাণ আগেই পাওয়া গিয়েছিল।
গণতান্ত্রিক ধারার পথে
এবার চলুন দেখি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দেশ পরিচালনায় তাদের চরম দুর্বলতা দেখাচ্ছিল এবং নির্বাচন বিলম্বিত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছিল, তখন জেনারেল ওয়াকার কী করলেন।
অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের দুর্বলতায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে দেশে আবারও সেনাশাসনের পক্ষে মতামত সৃষ্টি হতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহন করলে কেউ উচ্চবাচ্য করত না বরং আনন্দিতই হত। কিন্তু জেনারেল ওয়াকার দেশকে নির্বাচনমুখী করতে থাকলেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টা নিজেরাও সন্দিহান ছিলেন যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে কিনা, সেই পরিস্থিতির মাঝেও তিনি সব সময় স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়ে চললেন, ‘নির্বাচন সঠিক সময়েই অনুষ্ঠিত হবে’। তিনি নির্বাচন করালেন; রাষ্ট্রে একটা গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হল তারই প্রচেষ্টায়।
সামান্য বিবেচনা যাদের আছে এমন মানুষেরা নিশ্চয় বলতে বাধ্য হবেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যারা রাষ্ট্রের উচ্চ মহলে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্যে জেনারেল ওয়াকারের মত পরিক্ষিত দেশপ্রেমিকের দ্বিতীয় কোন উদাহরণ বাংলাদেশে নাই।
তাই আজ যারা তার সমালোচনা করে চলেছেন, তাদের জন্য বলছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা পড়েছেন নিশ্চয়ই; সেখানে এক অসাধারণ উপমা রয়েছে নিন্দা আর নিন্দুকের বিষয়ে। তিনি বলছেন, “কলঙ্কের প্রশস্ত জায়গা তারার মধ্যে নেই, চাঁদের মধ্যেই আছে”। যিনি যত বেশি প্রশস্ত, তাঁর ভুলগুলো যেন তত বেশি ধরা পড়ে; তবুও বলছি, চলুন জেনারেল ওয়াকারের সমালোচনা করি। হ্যাঁ, তিনিও আমার-আপনার মতোই খাবার খান, তিনিও মানুষ; আমরা প্রতিদিন যত ভুল করি, সেই ভুলের ঊর্ধ্বে তিনি নন। কিন্তু প্রজ্ঞার মানদণ্ডে তিনি যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা শত বছর কিংবা আরও বহু বছরে কেউ অতিক্রম করতে পারবে বলে মনে হয় না। প্রজ্ঞা কী জিনিস, তাঁর কাছেই সেটা শেখা উচিত।
লেখক : মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন