প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুর্গাপূজা মানে উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ এবং ঢাক-ঢোলের তাণ্ডব। ষষ্ঠী থেকে বিসর্জন পর্যন্ত ঢাকের আওয়াজ ছাড়া সবকিছুই অসম্পূর্ণ। এই প্রয়োজনের কারণে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে ঢাকের হাট বসছে।
যদিও নাম ‘ঢাকের হাট’, এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। মূলত এটি বাদকদের জন্য একটি মঞ্চ। তারা এখানে নিজেদের বাদ্যযন্ত্র বাজায় এবং দক্ষতা প্রদর্শন করে। পূজা আয়োজকরা সেই বাজনা শুনে পছন্দের বাদকদল নির্বাচন করেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে এ হাট শুরু হয়েছে এবং এটি ষষ্ঠীর (শুক্রবার) গভীর রাত পর্যন্ত চলবে। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি হাট নয়; বরং এটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সকাল থেকেই কটিয়াদী পুরান বাজার ঢাকের হাটে জমে উঠেছে। চারদিক থেকে ঢাক, ঢোল, কাঁসি, ঝনঝনি, করতাল এবং মন্দিরার শব্দ ভেসে আসছে। সানাই ও বাঁশির সুরও শোনা যাচ্ছে। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও বাজছে। সব মিলিয়ে যেন তাল ও সুরের বাজার। দলে দলে বাদকদল বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসছে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে।
সরেজমিনে হাটে গিয়ে দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের বাদকদলই সেখানে বেশি উপস্থিত। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ অন্তত ১০টি জেলা থেকে বাদকদল এসেছে। ঢাকের তালে চলছে প্রতিযোগিতা। কে বাজাবে সবচেয়ে ভালো এবং কার সুরে বেশি প্রাণ—এই লড়াই চলছে। পাশে দাঁড়িয়ে পূজা আয়োজকরা শুনছেন, দেখছেন এবং পছন্দ করছেন। দরদাম মিললে পছন্দের দলটিকে পূজামণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
দুই পক্ষের সম্মতিতে পারিশ্রমিক চূড়ান্ত হয়। পূজার দিনগুলোতে সেই দল মণ্ডপে গিয়ে বাজাবে ঢাক, সানাই, কাঁসি এবং করতাল।
হাটে গফরগাঁওয়ের কাজল চন্দ্র ভৌমিককে পাওয়া যায়। তিনি এক ঢাকির সঙ্গে ২২ হাজার টাকায় চুক্তি করেছেন। তিনি বলেন, ‘সবার বাজনা শুনেছি। যেটা মন ছুঁয়েছে, তাকেই নিয়েছি।’
হবিগঞ্জ থেকে জয়চন্দ্র কর্মকার ও আশীষ রবিদাস এসেছেন তাদের পূজায় একটি বাদক দল নেবেন বলে। তারা বলেন, ‘এই প্রথম ঢাকের হাটে এসেছি। খুব ভালো লাগছে। চেষ্টা করছি সাধ্যের মধ্যে ভালো একটা দল নিতে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটে একজন ঢাকির পাশাপাশি দলগত বাজনদলও রয়েছে। একজন ঢাকির পারিশ্রমিক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। দলের ক্ষেত্রে তা ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত যায়। বাদকদল প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত বাদ্য বাজাবে মণ্ডপে। এই কয়দিন তাদের সব দায়িত্ব আয়োজকদের।
বিক্রমপুর থেকে সুমন চন্দ্র দাস ও পরিমল দাস বলেন, ‘২০ বছর ধরে এখানে আসছি। আগে আমাদের বাপ দাদারা আসতেন। ফোনে চুক্তি করলেও পারতাম, কিন্তু ঢাকের হাটে না এলে মন মানে না।’ তবে তাদের অভিযোগ, ‘আমরা এ দিনটির জন্য অপেক্ষা করি। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। খাটাখাটনির তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তবু পূর্ব পুরুষের পেশা ধরে রেখেছি। আগে বাপ-দাদারা আসতেন, এখন আমি আসি।’
হাটে নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। খাবার পানি, শৌচাগার এবং থাকার সুব্যবস্থা নেই। যে যেখানে পারে, বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছেন। বৃষ্টিবাদল হলে আশ্রয় নেওয়ার কোনো জায়গা নেই।
বাদকদলের সদস্য খোকন মণিঋষি বলেন, ‘ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চাইলে দায়িত্বশীল হতে হয়। অবহেলায় ঐতিহ্য মরে যায়।’
৩০ বছর ধরে কটিয়াদীর ঢাকের হাটে আসছেন কাপাশিয়ার নন্দদুলাল দাস। তার ভাষ্য, ‘ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছে, কিন্তু যাইনি। হাটের টান তো অন্যরকম। তাই দলবল নিয়ে চলে এসেছি। এখানে না এলে আনন্দটা পাই না। আর বছরে একবার অনেক বাদকের সঙ্গে দেখা হয়।’ তিনি বলেন, ‘এবার এক আয়োজক এক লাখ ৩০ হাজার টাকা বলেছেন। সম্ভবত তার সঙ্গেই যাব।’ ছোট ও মাঝারি দল ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা চাচ্ছে।
ঢাকের হাটের তত্ত্বাবধানে রয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রী মা সংঘ। সংগঠনের সভাপতি শীতল চন্দ্র সাহা জানান, কটিয়াদীর ঢাকের হাট ষোড়শ শতকে শুরু হয়। সামন্তরাজা নবরঙ্গ রায়ের আমলে। একবার পূজার জন্য সেরা ঢাকি খুঁজতে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তিনি। তখন নৌকাযোগে বহু ঢাকি আসে কটিয়াদীতে। রাজা নিজে বাজনা শুনে সেরা দলটি বেছে নেন। সেই থেকেই ঢাকের হাট চলমান।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, এবার জেলায় মোট ৪১৮টি মণ্ডপে দুর্গোৎসব হচ্ছে। মণ্ডপের নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন