প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৩:১৫ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ইং; ০২:৫৬ পি.এম
ইরান যুদ্ধ কি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধ, নাকি মার্কিন একক আধিপত্যের ভিত নড়ে যাওয়ার সূচনা? এর দায় কার? ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুর? নাকি সে দেশের ভোট প্রদানকারী জনগণের? এই রাষ্ট্র দুটির জনগণ যদি রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ না হন তাহলে এমন মানসিক ভারসাম্যবিহীন, অস্থির প্রকৃতির, প্রকৃত অর্থেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা যাদের খুবই কম তারা কিভাবে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাচিত হন?
মার্কিন নাগরিকরা যদি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হন, ইসরাইলিরা যদি নিজেদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই বিচক্ষণ হন, তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মতো দুই নেতার হাতে বারবার রাষ্ট্রের ভাগ্য তুলে দেওয়া হয় কীভাবে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু আজ এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
কারণ এটি শুধু দুজন ব্যক্তির রাজনৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন নয়। এটি প্রশ্ন—একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকেরা কতটা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, কতটা তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত নেন এবং কতটা আবেগ, পরিচয়, ভয় ও প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হন।
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকদের রাজনৈতিক জ্ঞান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা হচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিভিন্ন জরিপে মার্কিন জনগণের রাজনৈতিক ও নাগরিক জ্ঞানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ধরা পড়েছে। এমনকি ২০২৩ সালের একটি পিউ কুইজে আমেরিকানদের সরকারি কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান যাচাই করা হয়েছিল। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের নাগরিক হওয়া আর রাজনীতি সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন হওয়া—এক জিনিস নয়। আর এই ফাঁকটাই রাজনৈতিক নেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ।
ট্রাম্প: রাজনীতির মঞ্চে নাকি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারখানা?ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সিদ্ধান্তকে স্থির নীতির চেয়ে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তিনি ব্যবসায়ী তিনি রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সত্যিই কি যোগ্য? একটি বিশ্ব পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধানের মুহূর্তে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদল ও অস্থির সিদ্ধান্ত কি রাষ্ট্রটির জন্য মঙ্গলজনক? আজ যে অবস্থান, কাল তার বিপরীত অবস্থান; আজ যুদ্ধের হুমকি, কাল আলোচনার বার্তা; আজ সর্বোচ্চ চাপ, কাল আবার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন হিসাব।
ইরান যুদ্ধ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান যুদ্ধে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপক পরাজয়ের গ্লানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয়ের পাশাপাশি সামরিক হামলা অব্যাহত রাখতে অক্ষমতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটি আত্মসমর্পণ করেনি, ভেঙে পড়েনি এমনকি তারা যুদ্ধের মধ্যেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের সামরিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা দিনে দিনে বৃদ্ধি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন সামরিক চাপে পড়ে বাঁচার পথ খোঁজার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ খুঁজছে। এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ শুরু করার আগে যদি একজন রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা রাজনৈতিক নেতার যুদ্ধের পরিসমাপ্তি বা পরিণতি কিংবা শেষটা জানা না থাকে, তাহলে যুদ্ধ শুরু করা কি কৌশল, নাকি হঠকারিতা?
একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি দিয়ে আঘাত করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই আঘাতের পর রাজনৈতিক ফলাফল কী হবে, প্রতিপক্ষ কীভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো কোন দিকে যাবে, বিশ্ববাজারে কী হবে, মিত্ররা কতটা পাশে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে সামরিক বিজয়ও কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত হতে পারে।
ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পর ঠিক সেই আশঙ্কাই সামনে এসেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধ এখন কার্যত ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করলেও তেহরান এখনো টিকে আছে এবং চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর ভর করে নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
আর এখানেই মার্কিন আধিপত্যের প্রশ্নটি সামনে আসে। নিষেধাজ্ঞা যদি আর আগের মতো কাজ না করে? ইতিমধ্যেই রাশিয়ার সাথে ইরান ২৫ বিলিয়ন ডলারের পরমাণু চুক্তি করেছে এর মাধ্যমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের প্রতি দেওয়া নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে। চীন ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিপরীত ঘোষণা দিয়েছে, পাকিস্তানসহ ইরানের সাথে সম্পর্ক ও বাণিজ্য সম্পর্ক রাখা রাষ্ট্রগুলো ঠিকই ইরানের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল কি? যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে পরাজয়ের পাশাপাশি এবার নিষেধাজ্ঞা দিলে সেই নিষেধাজ্ঞাকে যদি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বুড়ো আঙ্গুল দেখায় নিজেদের স্বার্থে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এখন কি করবে গোটা বিশ্বের সাথে কি যুদ্ধ করবে? তা সম্ভব নয় অর্থাৎ এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ আধিপত্যবাদী একটি শক্তির পরাজয়ের বিষয়ে স্পষ্ট করছে যাকে আর বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই ভয় না পেয়ে বরং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন শক্তির অন্যতম বড় অস্ত্র ছিল ডলার, আর্থিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কাঠামো এবং নিষেধাজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত না করেও তার অর্থনীতি বিপর্যস্ত করতে পেরেছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নিষেধাজ্ঞা নামক অস্ত্রের কার্যকারিতা যদি ধীরে ধীরে কমতে থাকে-এবং ইতিমধ্যেই তা কমতেও শুরু করেছে?
ইরান তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার।
ছয় মাসের যুদ্ধেও যদি ইরানকে রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা না যায়, যদি দেশটি বিকল্প বাণিজ্যিক পথ খুঁজে নিতে পারে, যদি চীন ও অন্যান্য রাষ্ট্র মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে বা তার সীমারেখায় থেকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে ভবিষ্যতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয় আগের মতো কার্যকর থাকবে কি? আর নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় অপর দুই পরাশক্তি চীন রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক করছে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো যারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতার পাশাপাশি আধিপত্যবাদের দুর্বলতাও খুঁজে পেয়েছে। সুতরাং পূর্বের মতো যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞাকে বিশ্ব হয়তো অচিরেই বুড়ো আঙ্গুল দেখাবে এমন কথা বলা অমূলক নয়।
এই প্রসঙ্গকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পিছিয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানেও বাস্তব ভূরাজনীতি মার্কিন ইচ্ছার সামনে সীমা তৈরি করছে।
এটাই সম্ভবত নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোর একটি। মার্কিন আধিপত্য একদিনে ভেঙে পড়বে—এমন কথা বলা এখন আর অতিরঞ্জিত নয়। এই একক আধিপত্যের কার্যকারিতা যদি ধীরে ধীরে কমতে থাকে, সেটি শনাক্ত করার জন্য বড় কোনো ঘোষণার অপেক্ষা করতে হয় না। রাষ্ট্রগুলো যখন বিকল্প শক্তিকেন্দ্র, বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং বিকল্প কূটনৈতিক পথ তৈরি করতে শুরু করে, তখনই পুরোনো ব্যবস্থার ভিত নড়তে শুরু করে।
নেতানিয়াহু: ইসরাইলের নিরাপত্তার রক্ষক, নাকি রাষ্ট্রটির ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি?
ইসরাইলের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি আরও নির্মম। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলি রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিদের একজন। তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা, শক্তি, সামরিক প্রতিরোধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে নিরাপত্তা নীতির নামে একের পর এক যুদ্ধ শুরু করা হচ্ছে, সেটি কি শেষ পর্যন্ত ইসরাইলকে আরও নিরাপদ করছে, নাকি তার শত্রু আরও বাড়িয়ে তুলছে?
২০২৬ সালের ইসরাইলি রাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, নেতানিয়াহুর প্রতি আস্থা আগের মতো অটুট নয়। জুলাইয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলেছিল, জনআস্থার সংকটের কারণে নেতানিয়াহুর পরবর্তী নির্বাচনে হারার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যদিও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যেও স্পষ্ট বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইসরাইলি জনগণের একটি অংশ যুদ্ধকে সমর্থন করলেও সরকারের সেই যুদ্ধ থেকে কাঙ্ক্ষিত বিজয় এনে দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে তাদের আস্থা কমেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু নেতানিয়াহু নন।সমস্যাটি হলো এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে নিরাপত্তা-ভীতি এত প্রবল যে যুদ্ধের প্রশ্নে রাজনৈতিক যুক্তি প্রায়ই আবেগের কাছে পরাজিত হয়।
তাহলে ইসরাইলিরা কেন এমন নেতৃত্বকে সুযোগ দেয়?এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত ‘ইসরাইলিরা রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ’—এত সরল নয়।
বরং সমস্যা আরও গভীর। একটি সমাজ যখন দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, নিরাপত্তা সংকট ও অস্তিত্বের ভয়ের মধ্যে থাকে, তখন জনগণ রাজনীতিকে আদর্শগত প্রশ্নের চেয়ে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন একজন নেতা যদি বলেন—‘আমি আপনাদের নিরাপদ রাখব’, তার অন্যান্য ব্যর্থতা অনেক সময় সেই একটি প্রতিশ্রুতির আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির একটি বড় উৎস এখানেই। এমনকি আজও ইসরাইলি রাজনীতিতে তার বিকল্প শক্তিগুলো একক রাজনৈতিক পথ দেখাতে পারছে না। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরও বিরোধীরা একটি স্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ বিকল্প নীতি হাজির করতে পারেনি। এখানেই গণতন্ত্রের এক নির্মম সত্য সামনে আসে:
জনগণ সব সময় সেরা নেতাকে নির্বাচন করে না; অনেক সময় তারা সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে শক্তিশালী বা সবচেয়ে ভয়ের সময়ে সবচেয়ে আশ্বাসদায়ক নেতাকেই নির্বাচন করে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মিল কোথায়?
দুজনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভিন্ন। তাদের দেশের রাজনৈতিক কাঠামোও ভিন্ন। কিন্তু তাদের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে—সংকটকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার ক্ষমতা। ভয় রাজনৈতিক পুঁজি। শত্রুর ভয় রাজনৈতিক পুঁজি। যুদ্ধের ভয় রাজনৈতিক পুঁজি।রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভয় আরও বড় রাজনৈতিক পুঁজি। আর যে নেতা জনগণকে বোঝাতে পারেন যে ‘শুধু আমিই আপনাদের রক্ষা করতে পারি’, তিনি নিজের ব্যর্থতাকেও রাজনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে পারেন।কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই মডেলের সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধের শুরুতে সামরিক শক্তির প্রদর্শন যতটা সহজ ছিল, ছয় মাস পরে যুদ্ধের সমাপ্তি ততটাই কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-সমর্থনও কমেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের পক্ষে মার্কিন জনসমর্থন মাত্র ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ট্রাম্পের অনুমোদনও ৩৩ শতাংশে নেমেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি ও অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। এগুলো ছোট সংখ্যা নয়।কারণ কোনো সাম্রাজ্যের শক্তি শুধু তার বোমার সংখ্যায় মাপা হয় না। শক্তি মাপা হয়—তার অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল, জনগণ কতটা যুদ্ধের পক্ষে, মিত্ররা কতটা নির্ভরশীল, প্রতিপক্ষ কতটা ভীত এবং বিশ্বব্যবস্থা তার নির্দেশ কতটা মেনে চলে—এসব দিয়ে।
ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে দিয়েছে? এমন দাবির সরাসরি উত্তর দেয়া না গেলেও এতটুকু দেয়া যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিশ্ব আধিপত্যবাদী এবং একক পরাশক্তির ক্ষমতা নিয়ে যে লক্ষ্য নিয়ে হামলা শুরু করেছিল সেই লক্ষ্য পরাজিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর একটি মনে করলেও ধীরে ধীরে তার অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্যের ইতি টানার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইসরাইলও দীর্ঘদিন থেকে নিজেকে সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্র মনে করলেও ইরান যুদ্ধের পর তাদের দুর্বলতা ক্রমানুযায়ী স্পষ্ট হচ্ছে।
কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে শুধু কে কতগুলো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে তা দেখলে হবে না।
প্রশ্ন হলো—কে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে? এ প্রশ্নের উত্তরটি সরল না হলেও এতটুকু স্মরণ যে ইরান পূর্বে যে অবস্থানে ছিল সেখানেই আছে, মাঝখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী শক্তির ঘাঁটিগুলো ধ্বংসের মাধ্যমে তাদের অবস্থান অনিশ্চিত করেছে, মিত্র রাষ্ট্রগুলোর বিশ্বাস ভেঙে গেছে, পাশাপাশি ইসরাইল তার নিরাপত্তাকে আরো ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ইরানকে যদি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করানো না-ই যায়, তার শাসনব্যবস্থা যদি ভেঙেই না পড়ে, তার অর্থনীতি যদি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পূর্বের মতোই টিকে থাকে, তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান যদি ছয় মাস পরও অনির্দিষ্ট থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে যদি একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার হিসাব করতে হয়—তাহলে অন্তত এটুকু বলা যায়, যুদ্ধটি সেই সরল ‘দ্রুত বিজয়’-এর গল্প নয়, যা শুরুতে তুলে ধরা হয়েছিল তা এখন মার্কিন ইসরাইলি অপরাজেয় শক্তির পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।আর এটাই মার্কিন আধিপত্যের জন্য বিপজ্জনক প্রশ্ন যা হয়তো অচিরেই ঘুনে ধরা বাঁশের মতো হুরমুড় করে ভেঙ্গে পড়বে
নতুন বিশ্বব্যবস্থা কি তাহলে শুরু হয়ে গেছে?
সম্ভবত ‘শুরু হয়ে গেছে’ বলার চেয়ে বলা ভালো—তার লক্ষণগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে এবং বিশ্ব একমুখী বিশ্বব্যবস্থা থেকে বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে ক্রমানুযায়ী অগ্রসর হচ্ছে এবং সম্ভবত সেটি দু-তিন বছর এর মধ্যেই বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হবে।
চীন, রাশিয়া, ইরান উত্তর কোরিয়া এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে—এমন আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই স্পষ্ট।ইরান যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে এবং করছে।
কারণ যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করবে, অন্য রাষ্ট্রগুলো তত বেশি বিকল্প অর্থনৈতিক পথ খুঁজবে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে, অন্য শক্তিগুলো তত বেশি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও জোট শক্তিশালী করার প্রয়োজন অনুভব করবে।এখানেই ইতিহাসের ব্যঙ্গ। একক আধিপত্যকে রক্ষা করতে গিয়ে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারই কখনো কখনো সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি করে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুকে নিয়ে নয়। সবশেষে প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নেতানিয়াহুর উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়।গণতন্ত্র কি সত্যিই সব সময় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পুরস্কার দেয়?
নাকি গণতন্ত্র কখনো কখনো জনগণের ভয়, ক্ষোভ, পরিচয়, বিভাজন ও আবেগকেও ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়ে দেয়?
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্থান সেই প্রশ্নের কঠিন উদাহরণ।আজ ইরান যুদ্ধ সেই প্রশ্নটিকে আরও নির্মম করে তুলেছে।
যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি ছয় মাস পরও শেষ হয়নি। যে নিষেধাজ্ঞাকে ইরানকে নত করার অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটি এখন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির নতুন পরীক্ষায় পড়েছে। যে সামরিক শক্তিকে সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেই শক্তিকেই এখন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি, অস্ত্রের মজুত, অর্থনীতি, তেলের দাম এবং জনসমর্থনের হিসাব করতে হচ্ছে।
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পরাশক্তির পতন সাধারণত একটি দিনে ঘটে না।
একটি যুদ্ধ, একটি নিষেধাজ্ঞা বা একটি ভুল সিদ্ধান্ত কোনো সাম্রাজ্যকে রাতারাতি ধ্বংস করে না। কিন্তু যখন একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক প্রস্তুতি, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং মিত্রদের আস্থা ক্ষয় করতে থাকে, তখন পতনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে—যদিও বাইরে থেকে সাম্রাজ্য তখনও শক্তিশালী দেখায়।
ইরান যুদ্ধই হয়তো মার্কিন আধিপত্যের পতন এখন অনিবার্য করে তুলেছে।
কিন্তু এই যুদ্ধ যদি প্রমাণ করে যে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক শক্তিও সব সমস্যার সামরিক সমাধান দিতে পারে না, বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক শক্তিও সব রাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না এবং তার মিত্ররাও সবসময় তার কৌশল অনুসরণ করবে না—তাহলে এটি অবশ্যই একক আধিপত্যের যুগের জন্য একটি ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা।
আর সেই সতর্কবার্তার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে দুটি নাম—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
তাদের রাজনৈতিক উত্থান তাই শুধু দুই নেতার সাফল্যের গল্প নয়। এটি গণতন্ত্রের একটি গভীর দুর্বলতার গল্পও হতে পারে—যেখানে রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগণও কখনো কখনো এমন নেতাকে ক্ষমতায় আনে, যিনি তাদের নিরাপত্তার নামে এমন সিদ্ধান্ত নেন, যার মূল্য শেষ পর্যন্ত সেই জনগণকেই দিতে হয়।
প্রশ্ন তাই এখন আর শুধু—ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কী ভুল করেছেন?প্রশ্ন হলো—তাদের ভুলের রাজনৈতিক মূল্য কে দেবে?
ইসরাইলি জনগণ?আমেরিকান জনগণ? উত্তর হলো হ্যাঁ, তাদের জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলে এমন অস্থির প্রকৃতির, রাজনৈতিকভাবে গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী নন, মানসিক ভারসাম্যহীনতা যাদের মধ্যে স্পষ্ট তাদেরকে কিভাবে এমন দুটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেন?
এই দুটি রাষ্ট্রের জনগণের নেতা নির্বাচনের ভুলের খেসারত কি শুধু তারাই দিচ্ছে নাকি তাদের নেতা নির্বাচনের ভুলের কারণে এর মাশুল দিচ্ছে ইরানি জনগণ?নাকি পুরো বিশ্ব?সময়ের সবচেয়ে কঠিন উত্তরটি সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে। গোটা বিশ্ব শাসনকারী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে যদি তাদের জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারে তাহলে তাদের বিশ্ব শাসনের আধিপত্যের ভার এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে চলে যায় কিংবা তাদের এরূপ অজ্ঞতার কারণেই আজ বিশ্ব একমুখী শাসনব্যবস্থা থেকে বহুমুখী শাসনব্যবস্থার সুফল পেতে চলেছে-যা সারা বিশ্বের জন্য অমঙ্গল জনক নয় বরং তাদের ভুলের খেসারত-ই বিশ্ব ব্যবস্থাকে নতুন একটি বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে যা বিশ্বের জন্য অকল্যাণকর নয় বরং বিশ্ব যা প্রত্যাশা করছে তেমনটিই হতে চলেছে- এমন কথা বলা আজকের দিনে অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন