প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেও ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় শরীয়তপুরের ইয়ামিন সরদার দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে লিবিয়ায় আট মাস ধরে নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন। তিনি দীর্ঘ বন্দিদশা শেষে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হলেও একই জেলার অন্তত ১৯ তরুণের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে তাদের স্বজনরা জীবিত নাকি মৃত— এই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
লিবিয়ায় নিখোঁজদের পরিবারগুলোর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার পরও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য মেলেনি। ফলে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। তারা মানবপাচারকারী দালালচক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
দেশে ফিরে আসা ইয়ামিন সরদার জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় দালাল জামাল বেপারীর মাধ্যমে লিবিয়ায় যান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে একটি মাফিয়া চক্রের কাছে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তার ওপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। তাকে মারধর করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হয়। ইয়ামিনের কথায়, আট মাস ধরে তাকে আটকে রেখে পরিবারের ওপর টাকা পাঠানোর চাপ সৃষ্টি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হত। পরিবারের সদস্যরা জায়গা-জমি বিক্রি করে দুই দফায় মোট ২৭ লাখ টাকা পরিশোধের পর গত মাসে তাকে দেশে ফেরায়।
দেশে ফিরে আসার পর ইয়ামিন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাও নেন। বর্তমানে কিছুটা সুস্থ হলেও তার শরীরজুড়ে মানবিক নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার পরিবার।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দালালচক্রের প্রভাবের কারণে কোনো সমাধান হয়নি। তারা জামাল বেপারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে জামাল বেপারী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কাউকে বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত নন।
সম্প্রতি শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের তুলাতলা গ্রামে নিখোঁজ ১৯ তরুণের স্বজনরা একত্রিত হয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করেন। এ সময় বাবা-মা, স্ত্রী, ভাই-বোন ও শিশু সন্তানদের কান্না পরিবেশকে ভারী করে তোলে। তাদের একটাই দাবি—নিখোঁজ স্বজনদের ফিরিয়ে আনা হোক।
স্বজনরা অভিযোগ করেন, মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য রাশেদ খান, কামরুজ্জামান টুন্নু খা এবং তাদের সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নিখোঁজদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাই আইন অনুযায়ী দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে নিউ নিকেষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক।
নিখোঁজ রাশিদুল ইসলামের বাবা সেলিম জমাদ্দার জানান, টুন্নু খা ও রাশেদ খান ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে কয়েক দফায় ১৮ লাখ টাকা নেন। পরে লিবিয়ায় ছেলের নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে আরও ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তিনি তার ছেলেকে বাঁচানোর আশায় ২০ শতাংশ জমিও লিখে দেন। তবে এক বছর পার হলেও তিনি ছেলের কোনো খোঁজ পাননি।
নিখোঁজ দিদার আকনের স্ত্রী আছিয়া বেগম জানান, তিনি যখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, তখন তার স্বামী লিবিয়ায় যান। তার সন্তান আজও বাবাকে দেখেনি। তিনি শুধু স্বামীকে ফিরে পেতে চান।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের চরযাদবপুর গ্রামের রাশেদ খান ‘লামিসা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর কাজ করতেন। তার সহযোগী ছিলেন জমজ ভাই কামরুজ্জামান টুন্নু খা। তাদের নেতৃত্বে একটি চক্র শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ করে অবৈধ পথে ইতালি পাঠানোর নামে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, পরে মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাঠাত।
২০২২ ও ২০২৩ সালে শরীয়তপুরের অন্তত ২২ তরুণকে এভাবে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। তাদের পরিবারের কাছ থেকে ১২ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। পরবর্তীতে কেউ লিবিয়ার কারাগারে, কেউ মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হন। তাদের নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আরও মুক্তিপণ আদায় করা হয়। গত বছরের ২১ ও ২২ মার্চের পর থেকে ওই যুবকদের অধিকাংশের সঙ্গে পরিবারের আর কোনো যোগাযোগ নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালালচক্র শুরু থেকেই পরিবারের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক নিয়ে রাখত। মামলা করার চেষ্টা করলে সেই চেক ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা ও হামলার ভয় দেখানো হতো। এ কারণে দীর্ঘদিন কেউ আইনের আশ্রয় নিতে সাহস পাননি। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশেদ খান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শরীয়তপুর আদালত ও পালং মডেল থানায় অন্তত ১১টি মামলা করেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা। এরপর থেকেই তাদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশ।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ মানবপাচার চক্রের কারণে শরীয়তপুরের হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কেউ পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ ফিরেছেন লাশ হয়ে, আবার অনেকে আজও নিখোঁজ। তাদের মতে, মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে নিখোঁজদের সন্ধান নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা বন্ধে কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করারও দাবি তুলেছেন তারা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন