প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন হাজার হাজার মানুষ। গুরুতর অসুস্থ রোগী থেকে শুরু করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য মানুষের শেষ ভরসা এই হাসপাতাল। অথচ সেই হাসপাতালকেই ঘিরে একজন কথিত রোগী-দালালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, হুমকি, দখলচেষ্টা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলু। একসময় হাসপাতালকেন্দ্রিক টোকাই ও রোগী-দালাল হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি বর্তমানে নিজেকে আউটসোর্সিং কর্মচারী নেতা হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার, কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে কথা বললেই শুরু হয় ভয়ভীতি প্রদর্শন। ফলে অনেকে অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেলোয়ারের প্রভাবের কারণে তারা অনেকটা জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, পূর্বের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দেলোয়ারের বক্তব্যও জানা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ করা ন্যায্যতার অন্যতম শর্ত।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, শেবাচিমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন রোগী ভাগিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর সঙ্গে দেলোয়ার জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ কিংবা বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে প্ররোচিত করা হতো। বিনিময়ে রোগীপ্রতি কমিশন পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
হাসপাতালে রোগী-দালালদের তৎপরতা নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মতো শেবাচিমেও দালালচক্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানের লক্ষ্য ছিল রোগী ও স্বজনদের হয়রানি বন্ধ করা এবং চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানমুখী করার প্রবণতা ঠেকানো।
হাসপাতালসংশ্লিষ্টদের দাবি, দেলোয়ারও একাধিকবার দালালি করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এ বিষয়ে র্যাবের পুরোনো অভিযান ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য যাচাই করে দেখা যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দালাল হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও হাসপাতালকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন দেলোয়ার।
পরবর্তী সময়ে হাসপাতালের আউটসোর্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের তৎকালীন সহকারী পরিচালক ডা. মোনায়েম সাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় চাকরি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
এরপর নিজেকে আউটসোর্সিং কমিটির সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন দেলোয়ার—এমন অভিযোগও রয়েছে। এই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি হাসপাতালের সাধারণ কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
তবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তার নিয়োগ কীভাবে হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছে, তার পদ বা দায়িত্ব কী ছিল এবং তিনি আদৌ কোনো কমিটির সভাপতি ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
কারণ, একটি সরকারি হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারী কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা বা প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়াই কীভাবে কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
দেলোয়ার বর্তমানে নিজেকে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের নেতা হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, বকেয়া বেতন আদায়, প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক বিষয়ে যোগাযোগ করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়।
কেউ কেউ এটিকে চাঁদা হিসেবে উল্লেখ করলেও দেলোয়ারের পক্ষ থেকে এসব অর্থের বৈধতা বা উদ্দেশ্য কী—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কর্মচারীদের অভিযোগ, নিয়মিত বেতন না পাওয়া কিংবা বেতনসংক্রান্ত জটিলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা কাগজপত্রের কাজের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
একাধিক কর্মচারী জানান, এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে অনেকে অভিযোগ থাকলেও প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
দেলোয়ারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক পদ বা দায়িত্ব রয়েছে কি না, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
দেলোয়ারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল চত্বরে একটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে টাকা দাবি করার ঘটনা।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, একটি অ্যাম্বুলেন্স শেবাচিম কম্পাউন্ডে প্রবেশ বা চলাচলের সময় সেটি আটকে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। চালক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু চাঁদাবাজির নয়, রোগী পরিবহনব্যবস্থায় সরাসরি বাধা এবং আইনশৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনাটির বিষয়ে কোনো মামলা, সাধারণ ডায়েরি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি রয়েছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
শেবাচিমের পঞ্চম তলার ডক্টরস ক্যান্টিন নিয়েও দেলোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যান্টিনটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে আসা মজেদ ও তার ছেলে আরিফুর রহমানকে সরিয়ে দিয়ে সেটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের অভিযোগ, ক্যান্টিনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ক্যান্টিনের বৈধ বরাদ্দ, ইজারা বা পরিচালনার অনুমতি কার নামে এবং এ নিয়ে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি বিরোধ রয়েছে কি না—সেসব নথিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সরকারি হাসপাতালের কোনো স্থাপনা বা ক্যান্টিনের নিয়ন্ত্রণ ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকার কথা নয়।
শেবাচিমে রোগী হয়রানি ও দালালচক্রের অভিযোগ নতুন নয়। তবে দালাল হিসেবে পরিচিত কেউ পরবর্তীতে কোনোভাবে হাসপাতালের আউটসোর্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসকের ভাষ্য, “র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দালালরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্টাফ পরিচয় দিলে রোগী ও স্বজনদের ওপর তাদের প্রভাব আরও বাড়ে।”
তাদের মতে, একজন কর্মচারীর প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকলেও যদি তিনি রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের কারণে হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারেন, তাহলে প্রকৃত কর্মচারীরা একদিকে যেমন চাপের মধ্যে পড়েন, অন্যদিকে রোগীসেবার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দেলোয়ারের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত। তাকে দুইবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে কারও মাদকাসক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে চিকিৎসা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি প্রয়োজন। তাই এ অভিযোগের ক্ষেত্রেও নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগকারীদের দাবি, চিকিৎসা নেওয়ার পরও তার আচরণে পরিবর্তন আসেনি এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার আগ্রাসী আচরণ অব্যাহত রয়েছে।
বরিশাল মেডিকেল রোডসংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে দেলোয়ারের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে, হোটেলটির বিরুদ্ধে প্রশাসনের কোনো ব্যবস্থা হয়েছে কি না কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো নথি রয়েছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে এমন অভিযোগ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
শেবাচিমের মতো একটি বৃহৎ সরকারি হাসপাতালে কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে হাসপাতাল প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে।
হাসপাতালের বর্তমান পরিচালকের অগোচরে একজন আউটসোর্সিং কর্মচারী কীভাবে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন—এ প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহলের অনেকে।
তাদের প্রশ্ন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মচারীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমা কী? তিনি কোনো কমিটির সভাপতি হওয়ার অনুমোদন পেয়েছিলেন কি না? কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে? তার বিরুদ্ধে আগে কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের চুক্তিপত্র, দায়িত্বের বিবরণ, হাসপাতাল প্রশাসনের অফিস আদেশ এবং অভিযোগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেলোয়ারকে ঘিরে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের মূল কাজ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু দালালচক্র, প্রভাবশালী কর্মচারী এবং বিভিন্ন ধরনের অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের কারণে রোগী ও স্বজনদের নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়।
একজন চিকিৎসক বলেন, “হাসপাতালে কে কর্মচারী আর কে দালাল—এ বিষয়টি স্পষ্ট থাকা উচিত। কোনো দালাল যদি কর্মচারীর পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে তা রোগীসেবার জন্য বিপজ্জনক।”
আরেকজন চিকিৎসক বলেন, “অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
অভিযোগের বিষয়ে র্যাব-৮-এর এক কর্মকর্তা জানান, র্যাবের সাদা পোশাকের দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কারা সিন্ডিকেট তৈরি করে সাধারণ রোগীদের বিভ্রান্ত করছে এবং ভুয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাচ্ছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। যেকোনো সময় এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
র্যাবের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের কার্যক্রম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে নয়।
দেলোয়ারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর কোনটি সত্য, কোনটি অতিরঞ্জিত কিংবা কোনটির পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে—তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
বিশেষ করে তার কথিত পূর্বের গ্রেপ্তারের রেকর্ড, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের নথি, কোনো কমিটির পদে থাকার অনুমোদন, কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্স আটকে টাকা দাবির ঘটনা, ক্যান্টিনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে লিখিত প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অভিযুক্ত দেলোয়ারের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানা গেলে প্রতিবেদনের ভারসাম্য আরও নিশ্চিত হবে।
শেবাচিমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালে রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা, কর্মচারীদের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ এবং চিকিৎসাসেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। ফলে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা কর্মচারী পরিচয় ব্যবহার করে হাসপাতালের পরিবেশকে প্রভাবিত করছেন কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলো সত্য হলে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র ও কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের ভূমিকা কী এবং প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রশ্রয় রয়েছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
কারণ, একটি সরকারি হাসপাতাল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের জায়গা নয়। এটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে দালালি, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ ও স্বচ্ছ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন