প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রামের রাউজানে সাধারণ যাত্রীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ বেপরোয়া চাঁদের গাড়ির (জিপ) চলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন এই চাঁদের গাড়িগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে, যার ফলে স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে থাকেন। স্থানীয়দের মুখে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে- চাঁদের গাড়ির এই দাপট বন্ধ করবে কে?
সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, রাউজানের ব্যস্ততম হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক, শহীদ জাফর সড়ক, নোয়াপাড়া সেকশন-১ ও ২ সড়ক, মাওলানা দোস্ত মো. সড়ক, অদুদিয়া সড়ক, হযরত এয়াছিনশাহ সড়ক, বাগোয়ানের বিভিন্ন উপ-সড়ক, নোয়াপাড়া, উরকিরচর, চিকদাইর, নোয়াজিষপুর, কদলপুর, পাহাড়তলী, ডাবুয়া, হলদিয়া, বিনাজুরি, বাগোয়ান, পূর্ব গুজরা, পশ্চিম গুজরা, পৌর এলাকা, কাপ্তাই সড়ক, রাঙ্গামাটি সড়ক এবং হলদিয়া ভিলেজ সড়কসহ গ্রামীণ সড়কগুলোতে চাঁদের গাড়ির দাপট দিন দিন বাড়ছে।
প্রতিটি সড়কে অদক্ষ এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া গতির কারণে পথচারীরা আতঙ্কিত হয়ে থাকেন। বিশেষ করে নম্বরহীন চাঁদের গাড়িগুলো বালি, ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী পরিবহন করছে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত সড়কজুড়ে এসব চাঁদের গাড়ির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। সকালে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সময় চাঁদের গাড়ির বেপরোয়া গতির কারণে তারা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হন।
নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বেপরোয়া গতির চাঁদের গাড়ির ধাক্কায় এয়াছিনশাহ সড়কের ফকিরটিলা এয়াছিন্নগর আদর্শ স্কুলের সামনে প্রাণ হারান এয়াছিনশাহ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. জাবেদ। এর দুবছর আগে একই সড়কে স্বাস্থ্যসেবা ফাউন্ডেশনের সামনে চাঁদের গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান এক ফার্নিচার মিস্ত্রি। প্রতিদিন এসব বেপরোয়া গতির গাড়ির ধাক্কায় বহু মানুষ আহত হচ্ছেন। অনেকেই আমৃত্যু পঙ্গুত্ববরণসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী হয়ে পরিবারের বোঝা হয়ে পড়ছেন এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন। অনেকের উপার্জনের পথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়তে হচ্ছে, চিকিৎসায় সহায় সম্বল হারিয়ে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সমাজের দ্বারে দ্বারে ধর্না দিতে হচ্ছে। এমনকি চাঁদের গাড়ির ধাক্কা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণীও।
এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর সকালে নিজ বাড়ি থেকে ভিলেজ সড়ক হয়ে মোটরবাইক নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন গর্জনিয়া রহমানিয়া ফাজিল মাদ্রাসার এবতেদায়ী শাখার প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ দিদারুল আলম। বিপরীত দিক থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা একটি চাঁদের গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পান তিনি। তিনি বলেন, "ট্রাক ও জিপ গাড়ির অদক্ষ চালকদের গাড়ি চালানোর সময় এক হাতে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। এতেই ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা।"
আজ ১০ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) দুপুরে নম্বরবিহীন এসব চাঁদের গাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক এবং রাউজান এয়াছিনশাহ কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. বিকিরণ বড়ুয়া বলেন, "একটি দুর্ঘটনা পরিবার, সমাজ, দেশ ও সমগ্র জাতির জন্য এক বিশাল ক্ষতি।" তিনি আরও জানান, "এগুলো অবৈধ গাড়ির লাইসেন্স, চালকের লাইসেন্স ও রোড পারমিটের বিষয়গুলো দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের। কিন্তু আমাদের দেশে আইন বা আইনের ধারাগুলো গেজেটেই সীমাবদ্ধ, প্রয়োগ নেই বললেই চলে।"
অধ্যাপক ড. বিকিরণ বড়ুয়া বলেন, "অর্থ উপার্জনের জন্য অবৈধ গাড়িগুলো সড়কে চলাচল করলেও তা রোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কঠোরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে এবং তরতাজা প্রাণ ঝরতে থাকবে।" তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের প্রতিটি বিভাগে তদারকির অভাব রয়েছে। এটি পূরণ করতে হলে শতভাগ সততার পাশাপাশি দেশপ্রেম লাগবে। একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া মানে দেশের সম্পদ ঝরে যাওয়া, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
তিনি উল্লেখ করেন, "মেয়াদউত্তীর্ণ এসব চাঁদের গাড়ি ৭০ বা ৮০-র দশকের। এখন এগুলোর সড়কে চলার বৈধ রোড পারমিট আছে বলে আমি মনে করি না। তাই এগুলো সড়ক থেকে উচ্ছেদ করা দরকার এবং দুর্ঘটনা রোধে এসব যান বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।"
নম্বরবিহীন ও ফিটনেসবিহীন এসব চাঁদের গাড়ির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন