প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মাজিয়া নামে এক ইরানি নারী যুক্তরাজ্য থেকে তেহরানে ৪০০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এসেছেন খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। তিনি জানিয়েছেন, তিনি শুধুমাত্র এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্যই দেশে ফিরে এসেছেন।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় যাওয়ার পথে মাজিয়া বলেন, ‘আমি বিশ্বকে জানাতে এসেছি যে ৪ হাজার বছরের পুরনো একটি সভ্যতাকে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। যে এটি ধ্বংস করতে চায়, সে আসলে নিজের দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ তার এই মন্তব্যের অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। তবে মাজিয়ার মন্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাব হয়েছে ঠিক উল্টো। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ ইরানকে আরো শক্তিশালী করেছে। এটি দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে।’ মাজিয়া মনে করেন, বিদেশি চাপ ইরানিদের জাতীয় ঐক্য ও সংকল্পকে দৃঢ় করেছে।
তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপমূলক নীতিরও সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘যারা অন্য দেশের সম্পদ কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।’ আমেরিকার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ এনে তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ দেন। গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশের আগে তিনি পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান, ‘সিরিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তানে যে ধরনের গণতন্ত্র দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।’
মাজিয়া বলেন, মিনাবের ট্র্যাজেডির স্মৃতি এখনো তাদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা এই শোকাবহ ঘটনা ভুলে যাইনি। এক দিনের জন্যও না।’ সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তাদের সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান। তার দাবি, নিরীহ শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এসব যুদ্ধ মূলত মার্কিন করদাতাদের অর্থ দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
এদিকে, ইরানের পতাকা হাতে শোকাহত মানুষের ঢল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে অব্যাহত রয়েছে, যেখানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছে। প্রয়াত নেতার শাহাদাত স্মরণে শিয়া সম্প্রদায়ের শোকগীতি রাজধানীজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ধৈর্য ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
তেহরানের প্রধান সড়কগুলো জাতীয় পতাকা, কালো শোকের ব্যানার ও ধর্মীয় প্রতীকে সজ্জিত করা হয়েছে। শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে অবস্থান নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্রমেই বাড়তে থাকা জনসমাগমকে নিয়ন্ত্রণ এবং পথনির্দেশনায় কাজ করছেন। আয়োজকদের ধারণা, শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।
আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁকে বিদায় জানাতে তেহরানজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। রাজধানীজুড়ে শোক, ধর্মীয় আবেগ ও রাজনৈতিক প্রতীকের ছাপ স্পষ্ট। তবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে আরেকটি দৃশ্য।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মিনাবের একটি মেয়েদের স্কুলে কথিত মার্কিন হামলায় নিহত ১৫০ জনেরও বেশি শিশুর ছবি সংবলিত পোস্টার টাঙানো হয়েছে। শোকবার্তার পাশে রাখা এসব ছবি মানুষের কাছে বারবার সাম্প্রতিক যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
যখন ইরান সাম্প্রতিক দশকগুলোর সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতার দাফন সম্পন্ন করছে, তখনো যুদ্ধের ক্ষত দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। নিহত শিশুদের ছবি সেই বেদনাদায়ক স্মৃতিকে আরো স্পষ্ট করে তুলছে। তেহরান থেকে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শেষকৃত্যের শোভাযাত্রা সোমবার কুম শহরে যাবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায়। সবশেষে ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে তাকে দাফন করা হবে।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সারা দিন ধরে খামেনির জানাজা ও শোকানুষ্ঠান চলছে। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো খামেনির কনিষ্ঠ নাতি-নাতনির ছবি, যা তার কফিনের পাশে রাখা হয়েছে। ছবিটি দেখে অনেক শোকাহত মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
এদিকে, গ্র্যান্ড মোসাল্লায় মানুষের ঢল অব্যাহত রয়েছে। পুরো তেহরানজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষত এখনো মানুষের মনে তাজা মনে হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির নেতৃত্ব অন্তত সাময়িকভাবে জনগণের বড় একটি অংশকে নিজেদের পাশে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন