প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৬:৩৫ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ১১:৪৩ পি.এম
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সমুদয়কাঠিতে শ্রীশ্রী শীতলা মায়ের সার্বজনীন মন্দিরের ব্যবহার্য ৪২ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগে স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মন্দির কমিটি, জমির শরিক ও এলাকাবাসী। জমিটি উদ্ধারে নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মন্দিরের সম্পত্তি ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার সমুদয়কাঠি বাজারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মন্দির কমিটির সভাপতি ও জমির শরিকদের পক্ষে মনোজ বিশ্বাস।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৬২ সালে সমুদয়কাঠি দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী শীতলা মায়ের মন্দিরের ব্যবহার ও ধর্মীয় উৎসবের জন্য ৪২ শতাংশ জমি দান করা হয়। দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে জমিটি মন্দিরের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে দাবি করেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি সর্বশেষ জরিপে জমিটি বিএস ১৩০ নম্বর খতিয়ানের ৯৫২ নম্বর দাগে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, ২০১৬ সালে শফিকুল ইসলাম হাওলাদার নেছারাবাদ সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা (নম্বর ৮২/২০১৬) করেন। মামলার আরজিতে জমিটির সর্বশেষ বিএস খতিয়ানের তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে দাবি মন্দির কমিটির। তাঁদের আরও দাবি, ১৯৯৯ সালের ২৪ মার্চ শফিকুল ইসলাম ও তাঁর ভাই সিদ্দিকুর রহমান তিনটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে জমি কিনলেও ওই দলিলগুলোর সীমানা বা দাগে মন্দিরের ৪২ শতাংশ জমির উল্লেখ নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঘটনায় একতরফা ডিক্রি নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মালিক ও মন্দির কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত না করে মামলাটি পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে আদালতের নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণের দাবি জানান তাঁরা।
মন্দির কমিটির অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শফিকুল ইসলাম হাওলাদার জমিটিতে প্রবেশ করে ধান চাষ শুরু করেন। তাঁর নামজারি রেকর্ডে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির উল্লেখ থাকলেও তিনি পুরো ৪২ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করছেন বলে দাবি করেন তাঁরা। ২০২৫ সালেও একইভাবে চাষাবাদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, চলতি বছর পুনরায় জমিতে চাষাবাদের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেন। পরে জমিটিকে শ্রীশ্রী শীতলা মায়ের মন্দিরের ব্যবহার্য ভূমি হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। জমিটি উদ্ধার করে আগের মতো পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান চালুর দাবি জানান মন্দির কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, জমির দখল নিয়ে প্রতিবাদ করায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তাঁদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ সময় বক্তব্যে জমির মালিকানা ও আদালতের নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, মন্দিরের ব্যবহার্য ভূমি উদ্ধার এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সমুদয়কাঠি দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী শীতলা মন্দিরের সভাপতি মনোজ বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক টুটুল আইচ, সমুদয়কাঠি রাধাকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক শেখর বাড়ৈ, বিশিষ্ট সমাজসেবক মুজিবুর রহমান, কৃষিবিদ বরুণ কর, সমাজসেবক জাকির হোসেন খান, সুমন খান, মরিয়ম বেগমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এর আগে এ জমি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, আদালতে জমি নিয়ে বিরোধ চলমান থাকা অবস্থায় জমিটি দখলে নিয়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। জমির মালিক ননী লাল বিশ্বাসের ছেলে মনোজ বিশ্বাসের দাবি, সর্বশেষ বিএস রেকর্ডে জমিটি আটজন শরিকের নামে রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় ইউপি সদস্য সুমন আইচ জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ওই জমিতে শীতলা পূজা হতে দেখে আসছেন।
এ বিষয়ে এর আগে শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি এবং মুঠোফোনে কল করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। সমুদয়কাঠি ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মো. আবু হানিফ তখন বলেছিলেন, শফিকুল ইসলাম হাওলাদার ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। তবে জমিসংক্রান্ত বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ জমি দখল করলে তার দায় দল নেবে না।
মন্দিরের জমি নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বক্তব্য এবং আদালতের নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসীরা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন