প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বিভিন্ন মাঠে সুবাসিত একানি বা একাঙ্গী ফসলের খেত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে কসবা ও জালশুকা গ্রামসহ উপজেলার মাঠজুড়ে সেই সুবাস এবং সবুজ সতেজতার মাঝে এখন বিষাদের ছায়া বিরাজ করছে। ক্ষতিকারক পচন রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অর্ধ শত কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। উপজেলা কৃষি দপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৮ হেক্টর জমি আক্রান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে প্রায় ১০-১৫ হেক্টর জমির একাঙ্গী ফসল পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় চাষিরা চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন; তাদের মাথায় হাত পড়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে লাভজনক এই ভেষজ ও মসলা জাতীয় উচ্চ মূল্যের ফসল একাঙ্গী চাষে তারা মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। চড়া দামে বীজ ক্রয়, জমি তৈরি, সার ও কীটনাশকের পেছনে জমানো পুঁজি ও হাড়ভাঙা খাটুনি ঢেলে একটি ভালো ফসলের স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ গোড়া পচা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করে একের পর এক খেত। গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঢলে পড়ার পাশাপাশি মাটির নিচের মূল্যবান একাঙ্গী পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গাংনীর কসবা গ্রামের (পূর্বপাড়া) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রবিউল ইসলাম ছলছল চোখে বলেন, "অনেক আশা করে ১০ শতক জমিতে একাঙ্গী চাষ করেছিলাম। ধার-দেনা করে সার ও কীটনাশক দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ পচন ধরে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো খেত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, আর পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব ভেবে পাচ্ছি না।"
একই কথা জানিয়েছেন কসবা গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন, বদরুদ্দোজা ও শনিবার (১৭ অক্টোবর) সরেজমিনে বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, একের পর এক খেত পচে লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফসল বাঁচাতে চাষিরা বারবার একাধিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না। অনেকেই পচা গোড়া উপড়ে ফেলে ক্ষোভ ও হাহাকার প্রকাশ করছেন। কৃষকদের অভিযোগ, রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি দপ্তরের কোনো কার্যকর তদারকি বা সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে বাজার থেকে নিম্নমানের কীটনাশক কিনে প্রয়োগ করায় উল্টো ক্ষতি আরও বেড়েছে।
ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকদের দাবি, অনতিবিলম্বে সরকারি প্রণোদনা, বিনাসূদে কৃষি ঋণ এবং আগামী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করা না হলে এই অঞ্চলে লাভজনক উক্ত মূল্যের ফসল চাষ একেবারেই বন্ধের উপক্রম হয়ে পড়বে। একই মতামত ব্যক্ত করেছেন কৃষক বদরুদ্দোজা ও সাদ্দাম আলী।
কৃষি বিভাগের ধানখোলা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাঈমুর রহমান জানান, চলতি বছরে একাঙ্গী পচন রোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুরুর দিকে চাষিদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করেও রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। অতি তাপমাত্রা ও অতিবৃষ্টির প্রভাবকে এর কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। একই অভিমত প্রকাশ করেছেন কসবা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিন রেজা জুয়েল ও গাড়াডোব ব্লকের গিয়াস উদ্দিন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আরাফাত মিয়া জানান, অনেক কৃষক বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করেন না। আবার অনেকে সঠিক জমি নির্বাচন না করে নিচু জমিতেও চাষ শুরু করেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এবার ফসল পচে গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আবহাওয়াগত পরিবর্তন এবং মাটিতে ছত্রাকের (Fungus) উপদ্রব বাড়ার কারণেই একাঙ্গী ফসলে এই পচন রোগ দেখা দিয়েছে। খবর পাওয়ার পর থেকেই আমরা মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করছি এবং পচন রোধে সঠিক মাত্রায় অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে যেন কৃষকদের পুনর্বাসনের আওতায় আনা যায়। এছাড়া বিষয়টি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রোগতত্ত্ববিদদেরও অবহিত করার চেষ্টা চলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন