প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে নতুন সীমান্ত সহযোগিতা চুক্তি ভারতের উদ্বেগ ও আপত্তির মুখে এসেছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে। দিল্লির বক্তব্য হলো, ওই এলাকায় পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত স্বীকৃত নয়।
পাকিস্তান ও চীন গত সপ্তাহে একটি প্রত্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদারের জন্য যৌথ কমিশন গঠনের বিষয়ে চুক্তি করেছে। পাকিস্তান এই চুক্তিকে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে ভারত এই চুক্তিটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। দিল্লির দাবি, তথাকথিত যৌথ কমিশনেরও কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
শাকসগাম উপত্যকা ঘিরে বিরোধ
নতুন চুক্তির আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মধ্যে শাকসগাম উপত্যকা রয়েছে। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান এই ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের অঞ্চলটি চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত অবশ্য সেই চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। দিল্লির দাবি, শাকসগাম উপত্যকা জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক দেশীয় রাজ্যের অংশ এবং পাকিস্তান এটি দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতীয় ভূখণ্ড ‘অবৈধভাবে ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে’ দখলে রাখা হয়েছে এবং পাকিস্তানের ওই ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার নেই।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের অবস্থান হলো, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত অঞ্চল। তাই ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির বৈধতা নিয়ে ভারতের প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে ইসলামাবাদ মনে করে।
দিল্লির শিব নাডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জেকবের মতে, সাম্প্রতিক উদ্যোগটি ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধেরই আরেকটি প্রকাশ। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৬৩ সালের চুক্তিতে যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা থাকলেও এত বছর পর কেন এটি কার্যকর করা হলো।
জেকবের মতে, এর পেছনে চীনের বৃহত্তর সীমান্ত নির্ধারণের উদ্যোগের পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সময়ে এই এলাকায় যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আগ্রহ কাজ করতে পারে।
ভারত-চীন সম্পর্কের স্পর্শকাতর সময়ে এই সীমান্ত সহযোগিতার ঘোষণা এসেছে, যখন কয়েক বছরের সামরিক উত্তেজনার পর ভারত ও চীন হিমালয় সীমান্তে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে বিতর্কিত লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) বরাবর সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালে লাদাখে দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এরপর দুই দেশ সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের পাশের এলাকায় চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতা বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
জাবিন টি জেকব বলেন, এ ঘটনায় ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁর মতে, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তির একটি ধারাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ওই চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে কাশ্মীর বিরোধ নিষ্পত্তির পর সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষের সঙ্গে চুক্তি পুনরায় আলোচনার কথা বলা হয়েছিল।
অবকাঠামো ও কৌশলগত স্বার্থ
পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এই অঞ্চলে ইতোমধ্যে বিস্তৃত অবকাঠামোগত ও যোগাযোগ সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এবং কারাকোরাম মহাসড়ক।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমি ও হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, নতুন যৌথ সীমান্ত কমিশন বাস্তবধর্মী ও রাজনৈতিক উদ্যোগ উভয়ই।
তাঁর মতে, সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষার জন্য কমিশনটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভারতের প্রতি চীনের একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
হাক্কানি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে চীন কখনো ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি। গিলগিট-বালতিস্তানকেও বেইজিং পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাকিস্তানও চীনের সঙ্গে ১৯৬৩ সালের চুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হয়েছে।
চীনের কৌশলগত বার্তা?
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সহযোগিতা আরও গভীর করার মধ্যে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক উভয় ধরনের স্বার্থ রয়েছে।
হুসেইন হাক্কানি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং একই সঙ্গে ভারতকে চীন ও পাকিস্তান—দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলগত বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
চুক্তি কার্যকরের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন হাক্কানি। তাঁর মতে, চীন সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক আগে পরিকল্পনা করে। ফলে যৌথ সীমান্ত কমিশন কার্যকরের সিদ্ধান্তও আগে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এর ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন চীন আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান জোরদার করছে।
অন্যদিকে অধ্যাপক জাবিন টি জেকব মনে করেন, আন্তর্জাতিক তথ্যপরিসরে চীনের তুলনামূলক প্রভাব ভারতের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাঁর মতে, চীনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃত উপস্থিতির কারণে বেইজিং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের বয়ান ও মানচিত্র তুলে ধরার সুযোগ বেশি পায়।
তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাব কতটা?
তবে এই চুক্তিকে সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন জাবিন টি জেকব। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে এলএসি বরাবর এর কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।
অর্থাৎ, গত সপ্তাহের ঘোষণার তাৎপর্য তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্তের পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার মধ্যে নাও থাকতে পারে। বরং ভারত যে ব্যবস্থাগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছে, সেগুলোকে পাকিস্তান ও চীন ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে—এটাই দিল্লির উদ্বেগের বড় কারণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এ বিষয়ে তাদের অবস্থানকে ‘স্পষ্ট ও ধারাবাহিক’ বলে জানিয়েছে। দিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তানের দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য এবং এতে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
হুসেইন হাক্কানির মতে, বিষয়টি শুধু সীমান্তের আইনি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বৃহত্তর ভূকৌশলগত বাস্তবতাও জড়িত। তাঁর ভাষায়, ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধের মূল জায়গাটি অনেকাংশে ভূকৌশলগত। ফলে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা এবং বাস্তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অর্জনেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাকিস্তান ও চীনের এই সীমান্ত সহযোগিতা তাই তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পরিবর্তনের চেয়ে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার উদ্যোগ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিবিসি বাংলা
পাকিস্তানের করাচির গওয়াদার বন্দর, যা চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডোর হিসাবে তৈরি হয়েছে
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন