প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
॥ এস এম আশিকুজ্জামান ॥
ঢাকা, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ : আজ বাংলাদেশের সংবিধান দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৭২ সালের এই দিনে গণপরিষদে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে এটি কার্যকর হয়।
একটি স্বাধীন দেশের জন্য সংবিধান একটি অনন্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। এই দর্শনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ‘সাংবিধানিক প্রাধান্য’ বা কনস্টিটিউশনাল সুপ্রিমেসি।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে সাংবিধানিক প্রাধান্যকে দেখা হয়। এর মানে হলো, দেশের সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সাংবিধানিক প্রাধান্য কী?
সাংবিধানিক প্রাধান্যের অর্থ হলো রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সংবিধানই সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের তিনটি মূল অঙ্গ— আইনসভা (সংসদ), শাসনবিভাগ (সরকার) ও বিচারবিভাগ— তাদের সকল ক্ষমতা সংবিধান থেকে প্রাপ্ত হয় এবং তাদের কার্যক্রমও সংবিধানের গণ্ডির মধ্যে পরিচালিত হতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে সাংবিধানিক প্রাধান্যের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’
অন্যদিকে, আমাদের সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ এর মানে হলো, এমন কোনো আইন পাস করা যাবে না, যা সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী।
সাংবিধানিক প্রাধান্যের গুরুত্ব কী? সংবিধানে নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, চলাফেরা ও সমাবেশের অধিকারসহ নানা মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। সাংবিধানিক প্রাধান্য নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্র বা সরকার নাগরিকদের এসব অধিকার খেয়াল খুশিমতো খর্ব করতে পারবে না।
এছাড়া, রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গ যেন অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে স্বৈরাচারী রূপ নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করে সংবিধান। আইনসভা আইন তৈরি করবে, শাসনবিভাগ তা প্রয়োগ করবে এবং বিচারবিভাগ তা ব্যাখ্যা করবে— এই ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য সাংবিধানিক প্রাধান্যের ফল।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় অগণতান্ত্রিক পন্থায় সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিচারবিভাগ তার বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের মূল কাঠামোকে রক্ষার চেষ্টা করেছে।
সর্বোপরি, সাংবিধানিক প্রাধান্যকে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিচারবিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা অপরিহার্য। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক। কোনো আইন বা পদক্ষেপ সংবিধানের পরিপন্থী হলে, তা বাতিল করার ক্ষমতা (জুডিশিয়াল রিভিও) সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। এই ক্ষমতার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই সাংবিধানিক প্রাধান্যকে সমুন্নত রাখতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন