প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উৎপাদনে বাড়তি খরচ, আর্থিক সংকট এবং বাজারের প্রতিযোগিতার কারণে খুলনা অঞ্চলের লবণ মিলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক সময় ৩২টি মিল সক্রিয় ছিল, বর্তমানে টিকে আছে মাত্র নয়টি। এই মিলগুলোতেও নিয়মিত উৎপাদন না হওয়ার ফলে শ্রমিকদের কাজ ও আয় কমে যাচ্ছে।
উদ্যোক্তারা শিল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিকায়নে সহায়তা চাচ্ছেন। তাদের মতে, অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ থাকলেও এই সুবিধা দীর্ঘমেয়াদী সংকট সমাধান করবে না। কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহন, পরিশোধন এবং বাজারজাতকরণের ব্যয় কমানো প্রয়োজন। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা জরুরি।
ভৈরব নদীর তীরে গড়ে ওঠা লবণ কারখানাগুলো ভোজ্য এবং শিল্প লবণ উৎপাদন করে, যা নদীপথে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাজারে পৌঁছায়। তবে বাড়তি ব্যয়ের চাপের কারণে সেই বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুরবী সল্টের ম্যানেজার আখিল হোসেন জানিয়েছেন, কক্সবাজার থেকে কাঁচামাল আনতে বাড়তি পরিবহন খরচ বহন করতে হয়। অনিয়মিত সরবরাহ এবং পরিশোধনের ব্যয় যুক্ত হওয়ায়, যদিও সক্ষমতা রয়েছে, নিয়মিত উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কারখানাগুলো আধুনিকায়নেও পিছিয়ে রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন, কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের সেই সামর্থ্য নেই। গ্যাসের অভাবও একটি বাধা হিসেবে কাজ করছে। ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে খুলনার মিলগুলো।
রমনা সল্টের স্বত্বাধিকারী সালাহ উদ্দিন আহমেদ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, সহজ শর্তে ঋণ এবং সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবস্থা করা গেলে উদ্যোক্তাদের সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করা সম্ভব।
পুরবী সল্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুল ইসলাম আধুনিকায়নে বিনিয়োগের সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে তারা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।
শ্রমিকদের সংসারে এই শিল্পের সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কারখানায় গুদাম থেকে কাঁচা লবণ বহন, পরিশোধনের যন্ত্রে দেয়া এবং প্যাকেটজাত করার কাজ চললেও আগের কর্মব্যস্ততা নেই। এক সময় যেখানে শতাধিক শ্রমিক কাজ করতেন, বর্তমানে সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন কাজ করছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মাসে ১৫ দিনও কাজ পাওয়া যায় না। কাজের সঙ্গে আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি চলমান মিলগুলোও বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তাদের জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
রাজাপুর সল্ট কারখানার শ্রমিক আবুল হাসান জানিয়েছেন, আগে মাসে ২৫ দিন কাজ থাকতো, কিন্তু এখন মাসে ১৫ দিনও কাজ মেলে না। কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একই মিলের আরেক শ্রমিক হারুনুর রশীদ বলেন, গত কয়েক বছরে ভৈরব নদীর তীরে বেশ কয়েকটি লবণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আগে এসব মিলে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, কিন্তু কিছু মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকের সংখ্যা নেমে এসেছে কয়েকশ’তে। বর্তমানে চালু থাকা মিলগুলোতে নিয়মিত কাজ না থাকায় পরিবারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আশা করেন, কারখানায় উৎপাদন বাড়লে কাজের সুযোগও বাড়বে।
গফুর হাওলাদার নামের আরেক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা তো আর কোনো কাজ জানি না। ৮-১০ বছর ধরে লবণ ফ্যাক্টরিতেই কাজ করছি। এখন যদি কাজ বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) খুলনা অঞ্চলের লবণ শিল্পের সংকট স্বীকার করছে। সংস্থাটির খুলনার উপ-মহাব্যবস্থাপক গোলাম সাকসায়েন জানান, উদ্যোক্তাদের সমস্যা সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হবে। তিনি সহায়তা ও সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন।
গোলাম সাকসায়েন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা মাঝে মধ্যেই মতবিনিময় করি। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ঋণ বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে আমরাও চেষ্টা করছি। এজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের উদ্যোগ নেব। আশা করছি খুলনা অঞ্চলের লবণ শিল্প আবারও হারানো দিনের ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন