প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৯:০৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ২২শে জুলাই, ২০২৬ইং; ০৯:১৭ এম
তামিল ভিলেন বাস্তবে শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হয়ে দিল্লির রাজপথে; মোদি' সরকারের দিন শেষ?
এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম জীবন্ত কিংবদন্তি তামিল সিনেমার এক পরিচিত রূপ জননন্দিত ভিলেন প্রকাশ রাজ রূপালী পর্দায় নায়িকার পিতার চরিত্রে কঠোর ভূমিকায় যেমন অভিনয় করেন তেমনি আজকে সমস্ত ভারতের সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে দিল্লির মসনদ কাঁপাতে ছাত্রদের আন্দোলনে সংহতি জানাতে আন্দোলনকারী ছেলে মেয়েদের সাথে দিল্লির জন্তর মন্ত্ররের মাটিতে এসে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি যন্তর-মন্তরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করেন। ভারতীয় মিডিয়া 'ইন্ডিয়া টুডে'র প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকাশ রাজ বলেন যে,
তিনি আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান এবং তিনি নিজের বিবেকের তাগিদে সেখানে গিয়েছেন। রয়টার্সের প্রকাশিত আলোকচিত্রেও ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচিতে প্রকাশ রাজকে অংশ নিতে দেখা যায়।
শুধু প্রকাশ রাজ নয় সাহিত্য, শিল্পী, সংস্কৃতি ও সংগীত জগতের অনেকেই ইতিমধ্যেই মোদির উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্ববাদ, একনায়ক ও স্বৈরশাসনের বিরোধীতার প্রতীক হিসেবে মাঠে নামা এই ককরোচ জনতা পার্টির ছাত্র - ছাত্রীদের পাশে এসে নিজেদেরকে সর্বভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক হিসেবে সমর্থন জানিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিনেমার পর্দায় যাকে দর্শক ভয় পেতে শিখেছে, বাস্তবের রাজপথে কখনো কখনো সেই মানুষটিই ক্ষমতাকে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি করে বসেন। দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন। চলচ্চিত্রে তিনি বহুবার কঠোর পিতা, নির্মম প্রতিপক্ষ কিংবা ক্ষমতার উদ্ধত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
অথচ বাস্তব জীবনে তাঁকে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার কাছেই প্রশ্ন তুলতে,আর সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বাস্তবেই আজ তাকে সহ অন্যান্য অনেক শিল্পীকে দেখা যাচ্ছে দিল্লির জন্তর মন্তরে সন্তানদের বাস্তবিক পিতা ও অভিভাবক হতে সিনেমার রূপালী পর্দা থেকে তাদের দুঃখ বেদনায় পাশে এসে মাঠে দাঁড়াতে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি নির্বাচন নয়; প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, পরিচয়, আনুগত্য কিংবা আবেগের দেয়াল তুলে দেওয়া হয়।
যে রাষ্ট্র নিজের সমালোচককে শত্রু ভাবতে শুরু করে, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের ছায়াকেই ভয় পেতে শেখে। ইতিহাসের পাতায় এমন উদাহরণ নতুন নয়। ক্ষমতা যত দীর্ঘস্থায়ী হয়, ততই তার চারপাশে প্রশংসার প্রতিধ্বনি জমে ওঠে; আর সেই প্রতিধ্বনি একসময় বাস্তবতার শব্দকে ঢেকে দেয়।
প্রকাশ রাজের মতো ভারতের বিখ্যাত তামিল সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পীরা যখন প্রকাশ্যে ভিন্নমত জানান, তখন বিষয়টি কোনো একক অভিনেতার অবস্থান থাকে না। এটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়—রাষ্ট্র কি ভিন্ন কণ্ঠকে সহ্য করার আত্মবিশ্বাস রাখে? নাকি সমালোচনা শুনলেই তাকে ষড়যন্ত্রের অভিধানে স্থান দেওয়া হয়?
ক্ষমতা প্রায়ই মনে করে জনপ্রিয়তা স্থায়ী। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনসমর্থনকে স্থায়ী সম্পদ ভেবে যারা আত্মতুষ্ট হয়েছে, তারাই একদিন জনমতের আদালতে সবচেয়ে কঠিন বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বিরোধী দল নয়; মানুষের জমে থাকা প্রশ্ন।
ভারতের চলচ্চিত্র জগতের শিল্পী, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীরা যখন নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে সরব হন, তখন সেটিকে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্যের চশমায় দেখলে ভুল হবে। শিল্পের ভাষা অনেক সময় রাজনীতির ভাষার চেয়ে গভীর হয়। একটি সংলাপ যেমন দর্শকের মনে থেকে যায়, তেমনি একজন শিল্পীর নৈতিক অবস্থানও জনপরিসরে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি তৈরি করতে পারে।
ক্ষমতার করিডোরে বসে হয়তো মনে হতে পারে—কিছু শিল্পীর বক্তব্যে কী-ই বা আসে যায়! কিন্তু ইতিহাস বলে, পরিবর্তনের সূচনা প্রায়ই সংসদের ভেতরে নয়, সমাজের বিবেকের ভেতরে হয়। সেই বিবেককে কখনো জাগিয়ে তোলেন একজন কবি, কখনো একজন অভিনেতা, কখনো একজন সাধারণ নাগরিক।
গণতন্ত্রে সরকারকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রশ্নহীন আনুগত্য গণতন্ত্রের শক্তি নয়; সেটি ক্ষমতার আরাম। আর যে গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার মানুষ কমে যায়, সেখানে করতালির শব্দ যত বাড়ে, নীরবতার ঝুঁকিও তত গভীর হয়।
প্রকাশ রাজ হয়তো একা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবেন না। কিন্তু তিনি একটি সত্য আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছেন—শিল্পী যখন রাজপথে দাঁড়ান, তখন তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন; তিনি সমাজের একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য নিজেই প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ান।
আর ইতিহাসের গতিপথ অনেক সময় সেই প্রশ্নচিহ্ন থেকেই শুরু হয়। আর এমন শিল্পী, সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের মানুষ যখন যেকোনো আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে পিতা হিসেবে পুত্র-কন্যা সমতুল্য ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে শুধু সমর্থন জানাতে আসেন তখন তারা গোটা সমাজের প্রতিনিধিত্ব করতেই যেনো এসেছেন বলে মানুষ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজপথ নেমে এসে স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট, একনায়কের গদিকেও নাড়িয়ে দেয়।
এমন ঘটনা ইতিমধ্যে অনেক দেখা গেছে শ্রীলংকা, নেপাল, মালদ্বীপ, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও ২৪ সালের জুলাইয়ের বর্ষা বিপ্লবে সন্তানদের সাথে অভিভাবকরা যখনই যোগ দিয়েছেন তখনই সরকারের গদি নড়ে গেছে। ভারতের দিল্লির মসনদ নিয়ে ক্ষমতাশীলদের মধ্যে কি তেমন কিছু হতে চলেছে-এমন প্রশ্ন করা আজকের দিনে মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন
কপিরাইট © ২০২৪-২৫ তালাশ বিডি.কম সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। || Design & Developed By "Talash BD Media Limited"