১২:৩০ পি.এম
মানুষ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চাঁদে ফেরার স্বপ্ন দেখে আসছে। কিন্তু এবার লক্ষ্য শুধু চাঁদে গিয়েই ফিরে আসা নয়।
বিজ্ঞানীরা সেখানে একটি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলে, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করার এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য চাঁদকে একটি যাত্রা ঘাঁটি বা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন।
এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে নাসা। সংস্থাটি আর্টেমিস-৩ মিশনের চার নভোচারীর নাম ঘোষণা করেছে এবং নাসা এই দলকে ‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ বলে অভিহিত করেছে।
আরও পড়ুন: বাগদাদে বায়ুদূষণ শীর্ষে, ঢাকার অবস্থান ১৩তম
আর্টেমিস কর্মসূচি নাসার দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ পরিকল্পনার একটি অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো এবং ভবিষ্যতে আরো গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানের পথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা।
আর্টেমিস-৩ মিশন কী?
অনেকে ধারণা করেছিলেন, আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে মানুষ সরাসরি চাঁদের মাটিতে নামবে। কিন্তু নাসা সেই পরিকল্পনার মধ্যে পরিবর্তন এনেছে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে আর্টেমিস-৩ উৎক্ষেপণ হতে চলেছে। কিন্তু এই মিশনের নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না। বরং এটি হবে একটি বড় ধরনের পরীক্ষামূলক অভিযান। মিশনের সময় নভোচারীরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করবেন। সেখানে বিভিন্ন মহাকাশযান ও প্রযুক্তির মধ্যে সংযোগ, সমন্বয় এবং পরিচালনা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে।
আরও পড়ুন: বৃহস্পতিবার ঢাকার মগবাজার, বেইলি রোড, সিদ্ধেশ্বরীসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বন্ধ
নাসা চায় যে, ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণের আগে সকল প্রযুক্তির কার্যকরীতা বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মিশন?
এই মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নাসার ওরিয়ন মহাকাশযানকে ভবিষ্যতের চন্দ্র অবতরণযানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রযুক্তি পরীক্ষা করা। চাঁদে মানুষ পাঠানোর আগে কক্ষপথে একাধিক মহাকাশযান নিরাপদভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজে বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠানগুলো স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্টেমিস-৩ ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করবে। এটি আর্টেমিস-২ এবং চাঁদে অবতরণ মিশনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করবে। নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ মিশনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে চাঁদের মাটিতে মানুষ নামানোর চেষ্টা করা হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর প্রথমবারের মতো মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে পা রাখবে।
কারা থাকছেন আর্টেমিস-৩ দলে?
আরও পড়ুন: নেসেটে ১৯ আসন পেয়েও সংশয়: নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে তো আরব দলগুলো?
চার সদস্যের এই দলে রয়েছে অভিজ্ঞ মহাকাশচারী, যারা দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার রেকর্ডধারী, একজন নতুন নভোচারী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থার প্রতিনিধি। মিশনের নেতৃত্ব দেবেন র্যান্ডি ব্রেসনিক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনীর সাবেক কর্নেল এবং একজন অভিজ্ঞ নভোচারী। এর আগে তিনি ১৫০ দিনেরও বেশি সময় মহাকাশে কাটিয়েছেন। দলের পাইলট হিসেবে থাকবেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার নভোচারী লুকা পারমিতানো। তিনি ইউরোপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মহাকাশচারীদের একজন এবং আর্টেমিস কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রথম ইউরোপীয় নভোচারীও। মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে থাকবেন ফ্র্যাঙ্ক রুবিও। তিনি টানা ৩৭১ দিন মহাকাশে অবস্থান করে একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে দীর্ঘতম মহাকাশযাত্রার রেকর্ড গড়েছেন। দলের চতুর্থ সদস্য আন্দ্রে ডগলাস, যিনি একজন প্রকৌশলী, রোবট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক উপকূলরক্ষী কর্মকর্তা। এটি হবে তাঁর প্রথম মহাকাশ ভ্রমণ।
নাসার মতে, ভবিষ্যতে চাঁদের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র পরিচালনা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ কেন?
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান আর্টেমিস-৩ দলের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’ (আর্থস ফার্স্ট স্টারফ্লিট) এর কথাটি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের কথা তুলে ধরেন, যেখানে মহাকাশ অনুসন্ধান শুধু এক দেশের সরকারি কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মহাকাশ সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা একসঙ্গে কাজ করছে। আর্টেমিস কর্মসূচিও এই বৈশ্বিক সহযোগিতার ফল। স্পেসএক্স চাঁদে মানুষের অবতরণের জন্য স্টারশিপ প্রযুক্তি তৈরি করছে। অন্যদিকে ব্লু অরিজিনও নিজেদের অবতরণযান উন্নয়নের কাজ করছে।
আরও পড়ুন: বর্জন ভেঙে কেন নির্বাচনে ভোট দিলাম: ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকের অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও নভোচারী দিয়ে এই কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব
চন্দ্র পোশাকে 'প্রাডা'?
সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের চন্দ্র পোশাক তৈরিতে ইতালির বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড 'প্রাডা'র সম্পৃক্ততার খবর আলোচনায় এসেছে। তবে বিষয়টি ফ্যাশনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। প্রাডা সরাসরি নাসার জন্য পোশাক তৈরি করছে না। তারা নাসার চুক্তিকারী প্রতিষ্ঠান 'অ্যাক্সিয়ম স্পেস'কে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। প্রাডা উন্নত কাপড়, বিশেষ উপকরণ এবং উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করছে। এই সহযোগিতার ফলে তৈরি হয়েছে নতুন অ্যাক্সইএমইউ স্পেসস্যুট। নতুন এই পোশাক নভোচারীদের চাঁদের চরম তাপমাত্রা, ধুলা ও বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দেবে। পোশাকটিতে বিশেষ শীতলীকরণ ব্যবস্থাও রয়েছে, যাতে নভোচারীদের শরীর ঠান্ডা রাখা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি: ট্রাম্প
চাঁদ থেকে মঙ্গলের পথে
আর্টেমিস-৩ মিশনের ঘোষণা এসেছে আর্টেমিস-২ এর সফলতার পর। ২০২৬ সালে আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। সেই মিশন প্রমাণ করেছে, নাসার ওরিয়ন মহাকাশযান গভীর মহাকাশে মানুষকে নিরাপদে বহন করতে সক্ষম। এখন আর্টেমিস-৩-এর দায়িত্ব হলো যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি মহাকাশযান ও প্রযুক্তি একসাথে কাজ করতে পারে তা প্রমাণ করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধাপটি চাঁদে অবতরণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপোলো কর্মসূচি প্রমাণ করেছে মানুষ চাঁদে পৌঁছাতে পারে, আর্টেমিস কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দেখানো যে মানুষ সেখানে দীর্ঘ সময় থাকতে পারে, ঘাঁটি তৈরি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই আর্টেমিস-৩ চাঁদে না নামলেও এর গুরুত্ব কম নয়। বরং এই মিশনের সফলতা নির্ধারণ করতে পারে ভবিষ্যতের চন্দ্র ঘাঁটি বা উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, মহাকাশ গবেষণা এবং মঙ্গল অভিযানের পথ।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, মানুষ আবার চাঁদে ফিরবে। আর সেই পথ ধরেই একদিন শুরু হতে পারে মঙ্গল গ্রহে মানুষের যাত্রা।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী চার দিনের জাপান সফর শেষে আজ দেশে ফিরছেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন