প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মানুষের জীবনে মূল্যবান জিনিস হলো ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা খ্যাতি নয়; বরং মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে সময়। কারণ হারিয়ে যাওয়া সম্পদকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও কখনো ফিরে আসে না। দিন ও রাতের অবিরাম আবর্তন, মাস ও বছরের পরিবর্তন, শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলা এসব বিষয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা এই পৃথিবীতে স্থায়ী নই; বরং একটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে অবিচলভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।
প্রতিটি সূর্যোদয় যেন আমাদের জীবনের নতুন একটি পৃষ্ঠা খুলে দেয়, আর প্রতিটি সূর্যাস্ত সেই পৃষ্ঠার হিসাব বন্ধ করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের জন্য সময়ের প্রবাহ ক্যালেন্ডারের পরিবর্তনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি আহবান হিসেবেও দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে যে আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।' (সুরা: হাশর, আয়াত: ১৮)
সময়ের পরিবর্তনে মানুষের জন্য শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে পরিবর্তনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ, শক্তির পর দুর্বলতা, যৌবনের পর বার্ধক্য এবং জীবনের পর মৃত্যু—এগুলি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, 'তোমরা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তীর্ণ হবে।' (সুরা: ইনশিকাক, আয়াত: ১৯)
একটি ঋতু আসে, এবং মানুষ তার জন্য প্রস্তুতি নেয়; একটি ঈদ আসে, এবং মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু অতীত হয়ে যায়। যারা একদিন একত্র ছিল, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং যে ঘর একদিন মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, তা একদিন নীরব হয়ে যায়। এভাবেই জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে এই পৃথিবী চিরস্থায়ী আবাস নয়; বরং এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র।
দিন-রাতের পরিবর্তনে আল্লাহর নিদর্শন
যারা চিন্তাশীল, তারা দিন ও রাতের পরিবর্তনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)
এরপর আল্লাহ তাঁদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন যাদের 'যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে।' (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৯১)
অতএব, প্রকৃত মুমিন সময়ের পরিবর্তন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজের আমল পর্যালোচনা করে।
নতুন হিজরি বছর আত্মসমালোচনার সময়
একটি বছর চলে গেছে এবং আরেকটি বছর শুরু হয়েছে। এই সময়টি শুধুমাত্র নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়; বরং এটি একটি নতুন জীবন গড়ার সুবর্ণ সুযোগও বটে। এই সময়ে একজন মুমিন স্ব-প্রশ্ন করতে পারেন—গত বছরে আমি কী অর্জন করেছি? আমার সালাত, তিলাওয়াত ও ইবাদতের অবস্থা কেমন ছিল? আমি কত মানুষের উপকার করেছি? আমি কত পাপ থেকে তাওবা করেছি? যদি আজ আমার মৃত্যু হয়, আমি কি প্রস্তুত? আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে।' (সুরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৩০)
অতএব, নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত আন্তরিক তাওবা, ইস্তিগফার এবং নেক আমলের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণের মাধ্যমে।
ডিজিটাল যুগে সময় অপচয়ের ভয়াবহতা
বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর মধ্যে একটি হলো সময়ের অপচয়। হাতে থাকা স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অজান্তেই তাদের জীবনের অমূল্য মুহূর্তগুলো গ্রাস করছে। দিন-রাত স্ক্রিনের সামনে কাটাতে কাটাতে অনেকেই ভুলে যাচ্ছে—কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া, আত্মউন্নয়ন, সমাজ ও উম্মাহর জন্য কাজ করা ইত্যাদি। একটি নোটিফিকেশন থেকে আরেকটি ভিডিও, একটি সংবাদ থেকে আরেকটি বিতর্ক—এভাবেই মূল্যবান জীবন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশিরভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)
অতএব, আসুন আমরা আমাদের অতীত ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করি, মহররম ও আশুরার ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো পালন করি, সময়ের সঠিক ব্যবহার করি এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আমরা যেন প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার, নেক আমলে জীবনকে সমৃদ্ধ করার এবং উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন