০৫:০৮ পি.এম
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ফলে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য হয়ে গেছে, যা নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। আসনটিতে কে সংসদ সদস্য হবেন, তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। সাবেক সংসদ সদস্য, কেন্দ্রীয় নেত্রী, অঙ্গসংগঠনের নেত্রী এবং জেলা পর্যায়ের সংগঠকদের মধ্যে অনেকেই মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় বিএনপির পরিচিত ও অভিজ্ঞ নেত্রীদের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অনেক নারী নেতা রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এবার মনোনয়ন চেয়েও পাননি, আবার কেউ সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মিষ্টির পদত্যাগের ফলে নতুন করে সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, দল বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের সংখ্যা বেড়েছে। পরিচিত নেত্রীদের বাইরেও অনেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং বিভিন্নভাবে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে শূন্য আসনে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেত্রীদের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
আরও পড়ুন: তেলের দাম কমবে কবে: রুশ উপপ্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসার পর রাজনৈতিক দায় নিয়ে মিষ্টি প্রশ্নের মুখে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিষ্টি।
মিষ্টির পদত্যাগের ফলে সংরক্ষিত নারী আসনের একটি পদ শূন্য হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক হারে রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসন পেয়ে থাকে। ফলে শূন্য হওয়া আসনটি বিএনপির ভাগে পড়েছে। দলটিই ঠিক করবে, নতুন করে কে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন।
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে নির্বাচন কমিশন এখনো তফসিল ঘোষণা করেনি।
এবার বিএনপির মনোনয়নে ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত ৩০ এপ্রিল তাদের নির্বাচিত হওয়ার গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ৩ মে তারা শপথ নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই সংসদ সদস্য পদ ছাড়েন মিষ্টি।
আরও পড়ুন: অরেগনের স্কুলে গুলিতে নিহত ৪, আহত ২; শোকে স্তব্ধ শহর
আলোচনায় যেসব নেত্রী
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শূন্য আসনটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির সহ-মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া। এর আগে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদের স্ত্রী পাপিয়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে যোগ্য নারীদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির উদারতার অভাব রয়েছে বলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হারুনুর রশিদ বিএনপির মনোনয়ন পেলেও জামায়াতের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। সে সময় দলের ভেতরে আলোচনা ছিল, সংরক্ষিত আসনে পাপিয়াকে সংসদ সদস্য করা হতে পারে। তবে বর্তমানে এ দম্পতির কেউই সংসদে নেই। ফলে তাদের অনুসারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
আলোচনায় রয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেত্রী অ্যাডভোকেট আসমা আজিজও। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এই নেত্রী দলের তৃণমূল পর্যায়ে পরিচিত। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্য এবং বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ওই সময়ে একাধিক রাজনৈতিক মামলার মুখেও পড়েন তিনি এবং বিভিন্ন ধরনের দমন-পীড়ন সহ্য করেন।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ, বিজিবির বাধা
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও আইনজীবী শাহানা আক্তার সানুও শূন্য আসনে মনোনয়ন পেতে তৎপর। ফেনীর সোনাগাজীর এই নেত্রী ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন। বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বও পান। এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য আয়শা সিদ্দিকা মনির নামও আলোচনায় রয়েছে। বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী এর আগে সরাসরি সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। ২০২৫ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নারীদের অবদানবিষয়ক বিএনপির একটি কমিটিতেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ মহিলা দলের নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।
শূন্য আসনটি ঘিরে আলোচনায় রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও আইনজীবী শাহিনুর বেগম সাগর। নোয়াখালীর এই নেত্রী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরে স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের তালিকায় তার নাম ছিল।
আরও পড়ুন: পিএমও ফেসবুক পেজটি দেখলে নাগরিকরা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গর্বিত হবে
মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকাও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন। তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় মহিলা দলের সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন।
বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে বরিশালে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক সূচিও মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। জেলা মহিলা দলের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ওই এলাকায় দলীয় কর্মসূচি ও জনসংযোগে সক্রিয় রয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে নাচোলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন তিনি।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরার নামও আলোচনায় এসেছে। ২০২২ সালের মে মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন তিনি। তিনটি সাংগঠনিক সম্পাদক পদের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৩৫ ভোট পেয়েছিলেন হীরা। প্রায় এক যুগ পর অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা নেতৃত্বে আসেন তিনি।
আরও পড়ুন: নেত্রকোণায় সাংবাদিক আলিফ হত্যায় অপূর্ব নামে যুবক আটক
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি রুনা লায়লাও সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের
বিএনপির দায়িত্বশীল এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি আসনের বিপরীতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা এক ডজনের বেশি। দলের অঙ্গসংগঠনে দীর্ঘদিন সক্রিয় নেত্রীদের পাশাপাশি সংসদে ভূমিকা রাখতে সক্ষম যোগ্য নারীদেরও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ওই নেতা বলেন, সব দিক বিবেচনা করেই একজনকে বেছে নেওয়া হবে। তবে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি এখনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেননি। ফলে এখন যেসব নাম আলোচনায় আসছে, সেগুলোকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার পর্যায়েই দেখতে হবে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৯০ জন
সব মিলিয়ে মিষ্টির ছেড়ে যাওয়া আসনটি ঘিরে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেত্রীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ আসে, তা নির্ভর করছে দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলের ওপর।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন