ইতিহাস কখনো দরজায় কড়া নেড়ে বলে না—‘একটি যুগ শেষ হতে যাচ্ছে।’ ইতিহাস নিঃশব্দে মাটির নিচে ভূমিকম্প তৈরি করে। তারপর একদিন হঠাৎ পৃথিবী আবিষ্কার করে—যে পাহাড়টিকে এতদিন অটল মনে হচ্ছিল, তার ভিতরে ফাটল ধরেছে, এবং একদিন তা ভেঙে পড়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সেই ধরনের একটি দিন। সেদিন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যায্য ও অবৈধ যৌথ হামলা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন এক আগুন জ্বালিয়েছে, যার শিখা এখন আর কেবল তেহরান, তেলআবিব কিংবা ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছয় মাস পরও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী; জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের প্রতিরোধ—সবকিছু মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন বৃহত্তর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের পরীক্ষাগার-যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতন এবং নতুন পরাশক্তি গুলোর উত্থান।
আর তাই প্রশ্নটি সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর—
মার্কিন আধিপত্যের পতনের ঘণ্টা কি বেজে গেছে? পতন হয়তো এখনও সম্পূর্ণ দৃশ্যমান নয়; কিন্তু তার শব্দ শোনা যাচ্ছে, একক আধিপত্য বাদী জংলি শাসনের অবসানের ঘন্টা ধ্বনির শব্দ ইতিমধ্যেই বিশ্ব শুনতে পাচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে নিজের আধিপত্যবাদী শক্তি বজায় রাখার জন্য নিজেদের অনৈতিক হলেও সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক মিত্রজোটকে একত্র করে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। যার বলির পাঠা হয়েছে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া সহ মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ এমনকি অমুসলিম কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোও। ভেনিজুয়েলা তার সর্বশেষ প্রমাণ, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের সেরা মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক শক্তি হিসাবে দাবি করে এবং বিশ্বে গণতন্ত্রের কথা মুখে বললেও বাস্তবে ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ লুটতরাজ করতে তার একটি বৈধ শাসন ব্যবস্থার সরকার প্রধানকে রাতের আধারে দস্যুতা করে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজ দেশে জেলে বন্দী রেখে পুতুল সরকার বসিয়ে সেই দেশের তেলের খনিজ সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে শুধু তাই নয়— মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, আমেরিকার জংলি শাসনের হাতে সামরিক হস্তক্ষেপ ও ভূরাজনৈতিক পরীক্ষার কী ভয়াবহ মূল্য গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষকে দিতে হয়েছে।
এই যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে দেখলে তার চারপাশে তৈরি করেছে সন্দেহের দেয়াল। কোনো সরকার মার্কিন নীতির বিরোধিতা করলে শুরু হয় নিষেধাজ্ঞার হাতুড়ি। কোনো রাষ্ট্র কৌশলগত স্বাধীনতা চাইলে তার ওপর তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের চাপ। আর কোনো রাষ্ট্র যদি নিজের সম্পদ, সামরিক সক্ষমতা কিংবা আঞ্চলিক প্রভাব দিয়ে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে চায়, তখন শুরু হয় তাকে দুর্বল করার নানামুখী কৌশল নিষেধাজ থেকে শুরু করে মানুষ হত্যা পর্যন্ত কিংবা কোন রাষ্ট্রকে ধ্বংস করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম্ভব কিছু ছিল না।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর অন্যতম একটি রাষ্ট্র হলো ইরান। কিন্তু এবার হিসাবের খাতায় যেন অন্য অঙ্ক এসে বসেছে। জংলি জানোয়ারের মত সভ্য দেশগুলো ধ্বংস করতে করতে কিংবা বাঘের মত অন্য প্রাণীদের শিকার করতে করতে এমনটাই অভ্যস্ত হয়েছে যে সেই সাহসে ভুল করে এবার মধ্য প্রাচ্যের সিংহের ফাঁদে এসে পা দিয়ে যেন নিজের বিপদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল নিজেরাই ডেকে নিয়ে এসেছে।
ইরানের ওপর আঘাত করে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ভেবে থাকে যে কয়েকটি ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা, সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোকে দ্রুত ভেঙে দেওয়া যাবে, তাহলে অন্তত এখন পর্যন্ত বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি, তারা এখন যুদ্ধ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়-কিন্তু ইরান সেই সুযোগ দিচ্ছে না।
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকে নিহত হন; কিন্তু ইরানি রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি, পারমাণবিক সক্ষমতা ও কমেনি সরকারেরও পতন হয়নি, ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন উৎপাদন না কমে বরং দ্বিগুণ তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সপ্তাহ থেকে এক মাসে শেষ করার ইচ্ছায় শুরু করা যুদ্ধ পরবর্তী মাসগুলোতে দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং ইরান এমন প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে যে, বিশ্ব মোড়ল খ্যাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী শক্তি ও মিত্র ইহুদিবাদী মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার খ্যাত অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের দশা এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। এখানেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।
যে শক্তি অন্যের সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল তারা এখন নিজ দেশেই তাদের নিজেদের সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কা করছে, সে কখনো কখনো যুদ্ধ শেষে আবিষ্কার করে—নিজের কৌশলটাই পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।
ইরানকে হাঁটু গেড়ে বসানোর পরিবর্তে যুদ্ধটিকে বিশ্বের ভূরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়, সেটিই আজ কৌশলগত চাপের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। হরমুজ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রবাহিত হওয়ায় এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। এখানে ইরানের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রে নয়; শক্তি তার অবস্থানে। ভূগোল কখনো কখনো এমন অস্ত্র দেয়, যা কোনো কারখানায় তৈরি করা যায় না। হরমুজ ইরানের সেই ভৌগলিক অস্ত্র। আর সেই অস্ত্র ব্যবহার করে ইরান যদি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অচলাবস্থায় ফেলতে পারে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—‘সুপার পাওয়ার’ শব্দটির অর্থ কি আগের মতোই আছে?
ছয় মাস পরের বাস্তবতা অন্তত বলছে, এটি কোনো দ্রুত বিজয়ের গল্প নয়। বরং সংঘাত রূপ নিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী শক্তির পরীক্ষায়। যুক্তরাষ্ট্রেই অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ছে, ইরান প্রতিরোধ ধরে রেখেছে, হরমুজে জ্বালানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং উভয় পক্ষই এখন একে অন্যকে নত করার জন্য দীর্ঘ শ্বাসের লড়াইয়ে ঢুকে পড়েছে। এখানেই ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রকৃত তাৎপর্য।
এটি কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নয়।
এটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে উদীয়মান নতুন বিশ্বব্যবস্থার সংঘর্ষের একটি অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরেই চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, চাপ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি। তাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা, জাতীয় স্বার্থ আলাদা, কৌশলও আলাদা। তাই তাদের কোনো একক ‘বিশ্বজোট’ হিসেবে দেখাটা সরলীকরণ হবেনা। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে ওয়াশিংটন এককভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম আর লিখবে না।
ইরানের প্রতিরোধ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। চীনের হাতে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। রাশিয়ার হাতে সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা। উত্তর কোরিয়ার হাতে কঠোর প্রতিরোধের সামরিক দর্শন। আর ইরানের হাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোল, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং হরমুজের মতো কৌশলগত চাপের কেন্দ্র।
এই শক্তিগুলো এক হয়ে গেলে কী হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এটা হয়তো আগামীকালই হবেনা,‘চীন-রাশিয়া-ইরান-উত্তর কোরিয়া’ পৃথিবীর নতুন সরকার হয়ে বসবে। এমন কথা বলা রাজনৈতিক রোমান্টিকতা হবে। কিন্তু এটুকু বলার যথেষ্ট কারণ আছে যে বিশ্ব এখন একক মেরু থেকে বহুমেরুর দিকে এগোচ্ছে।
একটি সাম্রাজ্য দুর্বল হলেই পৃথিবী স্বর্গ হয়ে যায় না। পুরোনো আধিপত্যের জায়গায় নতুন আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে ইতিহাস কেবল পোশাক বদলায়, চরিত্র বদলায় না। সুতরাং নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্নে—মানুষ আমেরিকাকে সরিয়ে আরেকটি ‘নতুন আমেরিকা’ চায় না। তারা এমন বিশ্ব চায়, যেখানে কোনো একটি রাষ্ট্র পৃথিবীর বাকি রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর স্থায়ী ভেটো ক্ষমতা নিয়ে বসে থাকবে না।
কিন্তু এই পরিবর্তনের পথে মুসলিম বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্যত্র। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই কেন এত দুর্বল? একসময় মুসলিম সভ্যতা ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, বাণিজ্য, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম কেন্দ্র। আজ সেই বিশ্বের বহু রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে বিভক্ত, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসী এবং বহিরাগত শক্তির নিরাপত্তা -ছাতার ওপর নির্ভরশীল। ক্ষমতার মোহ, অর্থের লোভ, রাজতন্ত্রের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক শক্তি বহু ক্ষেত্রে নিজের হাতেই ক্ষয় হয়েছে।
আর দুর্বলতার বাজারে ক্রেতা সব সময় থাকে।
ইরাক যখন দুর্বল হয়েছে, তার মাশুল ইরাক দিয়েছে। লিবিয়া যখন ভেঙেছে, তার মাশুল লিবিয়ার মানুষ দিয়েছে। সিরিয়া যখন যুদ্ধের আগুনে পুড়েছে, তার মাশুল সিরিয়ার মানুষ দিয়েছে। আফগানিস্তান যখন দশকের পর দশক যুদ্ধের মধ্যে থেকেছে, তার মাশুল দিয়েছে সাধারণ আফগান জনগন।
কিন্তু ইরান ভিন্ন। ইরান দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা একটি রাষ্ট্রকে দরিদ্র করতে পারে, কিন্তু সব সময় তাকে নত করতে পারে না। বোমা একটি ভবন ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু সব সময় একটি রাষ্ট্রের প্রতিরোধের ইচ্ছাকে ধ্বংস করতে পারে না। এই কারণেই ইরানের বর্তমান অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটার পরও ইরানি রাষ্ট্র টিকে গেছে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, আর ইরান সংঘাত থেকে সরে না গিয়ে প্রতিরোধের পথ ধরে রেখেছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক সমস্যা নয়—এটি আধিপত্যবাদের একটি কৌশলগত প্রশ্ন।
কারণ যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত ফল, সেই যুদ্ধ যদি ছয় মাস পরও শেষ না হয়, হরমুজ যদি বিশ্ববাজারের উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে থাকে, ইরানের সরকার যদি টিকে থাকে এবং মার্কিন নিরাপত্তা-গ্যারান্টি নিয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যেও নতুন প্রশ্ন জন্ম নেয়, তাহলে যুদ্ধের স্থপতিদের নিজেদের পরিকল্পনাই নতুন করে পর্যালোচনা করতে হয় তারা এ থেকে বাঁচবে কিভাবে? ইরানি রাজনীতির ভাষায় এটাকে বলা যায়—বিজয় না হয়েও প্রতিপক্ষকে মূল্য দিতে বাধ্য করা। আর তাতে ইতিমধ্যেই ইরান জয়লাভ করেছে।
আগামী দুই-তিন বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।এই সময়ে যদি ইরান তার বর্তমান প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, যদি চীন ও রাশিয়া তার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করে, যদি নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বিশ্বে বিকল্প বাণিজ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হয় এবং যদি অন্যান্য রাষ্ট্রও একক মার্কিন নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা বাড়ায়, তাহলে মার্কিন আধিপত্যের যে মানসিক দুর্গ কয়েক দশক ধরে অটুট মনে হয়েছে, তাতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। আজকের পৃথিবীতে আধিপত্য শুধু বিমানবাহী রণতরী দিয়ে টিকে থাকে না। আধিপত্য টিকে থাকে অন্যরা আপনাকে কতটা অপরাজেয় মনে করে তার ওপর। আর সেই অপরাজেয়তার ভাবমূর্তিতে যদি একবার আঁচড় লাগে, ইতিহাসের গতি বদলে যেতে পারে।
আজ বিশ্বের বহু রাষ্ট্র হয়তো নীরবে হিসাব করছে—কাকে বন্ধু বলা নিরাপদ, কার সঙ্গে বাণিজ্য করা ভবিষ্যতের জন্য লাভজনক, কোন সামরিক জোটে থাকা কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক এবং কোন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কাজে আসবে। যারা এই পরিবর্তনের গন্ধ পাচ্ছে, তারা নিশ্চয়ই নিজেদের কূটনৈতিক ছাতা একটু একটু করে বড় করছে।
আর যারা এখনও ভাবছে, ‘আমেরিকা আছে, তাই সব আগের মতোই থাকবে’—তারা হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সময়েও পুরোনো মানচিত্র আঁকছে।
ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—কোনো সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী নয়। রোম চিরস্থায়ী হয়নি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী হয়নি। সোভিয়েত শক্তিও চিরস্থায়ী হয়নি। তাহলে মার্কিন আধিপত্যই বা কেন অনন্তকাল থাকবে?
প্রশ্ন হলো, আমেরিকা কি আর এককভাবে বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক থাকতে পারবে? উত্তর—সম্ভবত আর আগের মতো নয়-তাতে ফাটল ধরেছে।
হরমুজের জলরাশি তাই শুধু তেলবাহী জাহাজ বহন করছে না; সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্নও।
কে নিয়ম বানাবে?কে নিয়ম মানাবে?
আর সবচেয়ে বড় কথা—কে ঠিক করবে, পৃথিবীর বাকি রাষ্ট্রগুলো কীভাবে বাঁচবে? ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর সেই প্রশ্নের উত্তর আর আগের মতো এককেন্দ্রিক নয়। চীন আছে। রাশিয়া আছে। ইরান আছে। উত্তর কোরিয়া আছে। আছে তুরস্ক, সৌদি পাকিস্তান ইতিমধ্যে মক্কা চুক্তি করেছে। আরবসহ আরও বহু রাষ্ট্রের নিজস্ব হিসাব রয়েছে। বিশ্ব ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে একাধিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে নিজস্ব বলয় তৈরি করবে।এটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হতে পারে।কিন্তু সেই নতুন বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, সেটিই আসল পরীক্ষা।
আমরা কি একটি আধিপত্যের বদলে আরেকটি আধিপত্য পাব? নাকি এমন একটি পৃথিবী তৈরি হবে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রের পাশাপাশি দুর্বল রাষ্ট্রেরও সার্বভৌমত্বের মূল্য থাকবে? ইরানের যুদ্ধের প্রকৃত ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই।
আজ হয়তো কেউ বলবে—এ শুধু আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। কিন্তু ইতিহাস যদি কয়েক বছর পর ফিরে তাকায় এবং দেখে যে হরমুজের তীরে দাঁড়িয়েই এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রথম বড় ফাটলটি দৃশ্যমান হয়েছিল, তাহলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আর কেবল একটি তারিখ থাকবে না।সেটি হয়ে উঠবে একটি প্রতীকের নাম।একটি পুরোনো আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন শক্তির উত্থানের প্রতীক।
আর তখন ইতিহাস হয়তো সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটিই করবে—যে আমেরিকা এতদিন অন্যদের সরকার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখত, সেই আমেরিকাই কি একদিন বুঝতে বাধ্য হবে—বিশ্ব বদলে গেছে? হয়তো সেই পরিবর্তন এখনো অসম্পূর্ণ। হয়তো পথটিও খুব দীর্ঘ নয়। হয়তো সামনে আরও যুদ্ধ, আরও নিষেধাজ্ঞা, আরও কূটনৈতিক সংঘর্ষ অপেক্ষা করছে কিন্তু এটি ঘটবে।হরমুজের জলরাশি আজ একটি কথাই স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ব আর আগের বিশ্ব নেই।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্নও তাই ‘কে আমেরিকাকে প্রতিস্থাপন করবে’ নয়। প্রশ্ন হলো—এবার কি পৃথিবী কাউকেই এককভাবে পৃথিবী শাসনের অধিকার দেবে-মনে হচ্ছে না, বিশ্ব হয়তো একটি জংলি একক শাসন থেকে বহু শক্তির একাধিক আধিপত্য দেখবে যেখানে থাকবে না কোন একক আধিপত্যবাদি শক্তির হাতে গোলামীর চাবিকাঠি। এবং সেই সময় অতি সন্নিকটে, দরজায় কড়া নাড়ছে-এমন কথা আজকের দিনে বলা মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।