প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলায় এক মা এবং তার দুই শিশু কন্যার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে।
ঘটনার পরপরই পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলা হলেও, নিহত ইতি রানীর স্বজনরা এই অভিযোগে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।
বুধবার (৩ জুন) বিকালে বরগুনা শহরের থানাপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী (৩৪), তার বড় মেয়ে আরাধ্য বিশ্বাস (১১) এবং ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ দুটি পৃথক কক্ষ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
ঘটনার পর বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও কক্ষের পরিস্থিতি বিচার করে প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত বিশ্লেষণ কিংবা ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল আসার আগেই এমন মন্তব্য করায় স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
নিহত ইতি রানীর জা মনি রানী উল্লেখ করেছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ আত্মহত্যার কথা বলছে, যা নিয়ে তাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে। তারা মনে করেন এটি নিশ্চিতভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
স্বজনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শুধু ইতি রানী ও তাঁর সন্তানদের ডাকবাংলোয় প্রবেশের দৃশ্য দেখা গেছে, কিন্তু এর আগের বা পরের কোনো ফুটেজ রয়েছে কিনা তা প্রকাশ করা হয়নি।
নিহতের ভাই মিত্র সরকার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঁচ মিনিটের ফুটেজ দেখানো হয়েছে। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ ভিডিও কোথায়? তারা জানতে চাইছেন, কারা সেখানে প্রবেশ করেছে বা বের হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ইতি রানীর সেদিন ডাকবাংলোয় কাজ করার কথা ছিল না, সেই সাথে তার মেয়েরাও আগে কখনো সেখানে যেত না। তাই ওই দিন তাদের ডাকবাংলোয় উপস্থিত হওয়াটাই রহস্যজনক।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডাকবাংলোর ৪ নম্বর কক্ষ থেকে ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩ নম্বর কক্ষ থেকে পাওয়া যায় বড় মেয়ে আরাধ্যের মরদেহ। একই পরিবারের সদস্যরা কেন আলাদা কক্ষে অবস্থান করছিল, মৃত্যুর আগে তাদের অবস্থান কী ছিল এবং কক্ষগুলোর দরজা কীভাবে বন্ধ হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঘটনাস্থলে দেখা যায়, ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই। ডাকবাংলোর তত্ত্বাবধায়ক নুরুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করেছেন যে, গ্রিল না থাকায় অতিথিরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। তবে বারান্দার থাই গ্লাসের লকগুলো নষ্ট কি না, সেই বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বৃহস্পতিবার বিকালে ইতি রানী ও তাঁর দুই কন্যার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজন ও এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত করেন। তারা শহরের বিভিন্ন সড়কে মরদেহ নিয়ে মিছিল করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেছেন, আমার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তিনি সুষ্ঠু তদন্ত চান। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি করেছেন।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। মরদেহের বিভিন্ন নমুনা উন্নত রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ অথবা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা ফিরতি বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। হত্যা মামলার জন্য এখনো নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন