প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনায় দৈনিক কালবেলার জেলা প্রতিনিধি মোঃ আসাদুল হক সবুজকে এক চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতারের পর আদালতে সোপর্দ করার পূর্বে বিতর্কিতভাবে ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করানোর অভিযোগ উঠেছে বরগুনা সদর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। মাদক সংক্রান্ত কোনো মামলা বা সরাসরি অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া না মেনে কিংবা আদালতের অনুমোদন ছাড়াই এই টেস্ট করানো নিয়ে দেশজুড়ে আইনজ্ঞ ও সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মামলার বিবরণ ও গ্রেফতার: পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার একটি জমি বেকু দিয়ে ভরাট করা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (আমলী আদালত-১, বরগুনা)-এ নালিশি দরখাস্ত দায়ের করেন স্বপন কুমার ঘোষ নামের এক ব্যক্তি। আদালতের নির্দেশে বরগুনা সদর থানায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:১০ মিনিটে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয় (মামলা নম্বর-৪২, ধারা: ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩৮৫/৪২৭/১০৯/৫০৬(২) পেনাল কোড)। উক্ত মামলায় দৈনিক কালবেলার প্রতিনিধি আসাদুল হক সবুজকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়।
পরবর্তীতে বরগুনা সদর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।
হ্যান্ডকাফ পরিহিত ছবি ভাইরাল ও ডোপ টেস্ট বিতর্ক: গ্রেফতারের পর আসামির হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো অবস্থায় কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় নানা আলোচনা। পাশাপাশি আদালতে সোপর্দ করার আগে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ডোপ টেস্ট করানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আক্রোশ থেকে পুলিশের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করতে এই পদক্ষেপ নেয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার হওয়া একজন সাংবাদিকের মাদক সংক্রান্ত কোনো ইতিহাস বা বর্তমান অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও এভাবে পরীক্ষা করানো আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয়।
আইন কী বলে? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী, কোনো আসামির ক্ষেত্রে ইচ্ছামাফিক ডোপ টেস্ট করানোর সুযোগ নেই:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮: উক্ত আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী, কেবল মাদক সেবন, বহন বা মাদক সংক্রান্ত অপরাধের সুনির্দিষ্ট মামলা বা অভিযোগ থাকলে এবং সুনির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণের ভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষা করা যায়।
চাঁদাবাজির মতো সাধারণ ফৌজদারি মামলায় তদন্তের স্বার্থে শারীরিক নমুনা বা পরীক্ষা করাতে হলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (IO) প্রথমে সংশ্লিষ্ট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করে লিখিত অনুমতি নিতে হয়।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা বা শরীরের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মোঃ আজিজুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডোপ টেস্ট করানোর বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (পুলিশ সুপার ও ওসি) এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
পরবর্তীতে বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, যৌথ অভিযানের সময় আসামির আচরণ দেখে সন্দেহ হওয়ায় জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডোপ টেস্ট করানো হয়েছিল। পরবর্তীতে উক্ত ডোপ টেস্টের ফলাফল ‘নেগেটিভ’ এসেছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ডোপ টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসায় পুলিশ প্রশাসনের এই অতিরঞ্জিত ও তড়িঘড়ি ভূমিকা নিয়ে জেলাজুড়ে সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পেশাদার একজন সাংবাদিককে হেয় প্রতিপন্ন করার হীন উদ্দেশ্যে আইন বহির্ভূতভাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন