প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজের মাঝে কাগজের টুকরোয় কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন ওয়াং জিবিং। তার এই লেখালেখিই তাকে চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য সম্মাননা এনে দিয়েছে।
ডেলিভারি রাইডারদের কঠিন ও সংগ্রামময় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা তার কবিতা ‘লো ফ্লাইট’ সম্প্রতি লু শুন সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেছে। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক ডি লু শুনের নামেই এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে। ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং ২০১৯ সালে খাবার সরবরাহকারী রাইডার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তার কবিতা এবং প্রবন্ধগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং তিনি একজন পরিচিত লেখক হয়ে ওঠেন।
ওয়াং জিবিং এই ক্রমবর্ধমান শ্রমজীবী লেখকদের একজন, যারা তাদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন করছেন। তাদের লেখায় চীনের বিশাল ‘গিগ ইকোনমি’তে কাজ করা মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, চাপ ও বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। ওয়াংয়ের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারটি দীর্ঘ কয়েক দশক বিভিন্ন খণ্ডকালীন এবং কঠোর পরিশ্রমের কাজ করার পর এসেছে।
১৫ জুলাই পুরস্কারজয়ের খবর প্রকাশ পেলে তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমি খুবই উদ্বিগ্ন ও নার্ভাস ছিলাম। খবরটি প্রকাশের পর যেন স্বস্তি ফিরে এসেছে।’ তিনি আরো জানান, গণমাধ্যমের অতিরিক্ত আগ্রহ তাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি চাপের মধ্যে ফেলেছিল।
লু শুন সাহিত্য পুরস্কারের সঙ্গে কত অর্থ দেওয়া হচ্ছে, সেই বিষয়ে বর্তমানে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১ লাখ চীনা ইউয়ান (প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার)। চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াং জিবিং পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে কিশোর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করার আগে তিনি নির্মাণশ্রমিক, আবর্জনা সংগ্রহকারী এবং রাস্তার দোকানে পণ্য বিক্রেতাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করেছেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে লেখালেখির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্যেও বই পড়ার প্রতি ওয়াং জিবিংয়ের আগ্রহ কখনো কমেনি। গত এক দশক ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছেন।
২০২২ সালে তার ‘ম্যান ইন এ হারি’ শিরোনামের একটি কবিতা অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কবিতাটি ২০১৯ সালের একটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়, যখন এক গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ার ফলে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তিনি ‘ম্যান ইন এ হারি : পোয়েমস অব এ ফুড ডেলিভারি রাইডার’ নামে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।
মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেও ওয়াং জানিয়েছেন, চাকরি ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চান। গ্লোবাল টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এখন জীবিকা নির্বাহের জন্য এই চাকরির ওপর আমার নির্ভর করতে হয় না। তবে আমি এই কাজটি চালিয়ে যেতে চাই, কারণ এর পরিবেশ আমার ভালো লাগে এবং এটি আমাকে শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখে। আমি সাধারণ জীবনযাপন করতে চাই। এই পুরস্কার আমার পরিচয় বা জীবনদর্শন বদলে দিতে পারবে না।’
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ হলো ডেলিভারি রাইডারদের জীবন ও অভিজ্ঞতার ওপর লেখা কবিতার একটি সংকলন। বইটি রচনার জন্য ওয়াং জিবিং প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও মতামত সংগ্রহ করেছেন। সংকলনের একটি উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি হলো, ‘কে বলে ডানা মেললেই আকাশে উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।’ এই লাইনটি সাধারণ মানুষের সংগ্রাম এবং মর্যাদাকে তুলে ধরে।
ওয়াংয়ের এই সাফল্য এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন চীনে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং জীবনসংগ্রাম তুলে ধরছেন এবং সাহিত্য অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করছেন। প্রাক্তন কুরিয়ার হু আনিয়ানের ২০২৩ সালে প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং’ চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও নজর কেড়ে নেয়। বইটির ইংরেজি অনুবাদ গত বছর প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া ‘আই অ্যাম ফ্যান ইউসু’ নামে একজন অভিবাসী শ্রমিকের আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ ২০১৭ সালে চীনের ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা ওই লেখাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিল যে, গণমাধ্যমের অতিরিক্ত আগ্রহ ও চাপের কারণে লেখক ফ্যান ইউসুকে কিছু সময়ের জন্য তার বাড়ি ছেড়ে থাকতে হয়েছিল।
ওয়াং জিবিং যে লু শুন সাহিত্য পুরস্কারটি পেয়েছেন, সেটির নামকরণ করা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী চীনা লেখক লু শুনের নামে। তিনি ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও উপন্যাসের মাধ্যমে চীনের তৎকালীন সমাজব্যবস্থার সমালোচনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। চীনা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব লু শুন আজও ব্যাপকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার লেখাগুলো নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নতুনভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কয়েক বছর আগে তার একটি উপন্যাসের চরিত্র ‘কং ইজি’ চাকরি খুঁজতে হিমশিম খাওয়া চীনা তরুণদের হতাশা ও মোহভঙ্গের প্রতীক হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি জনপ্রিয় ‘মিম’-এ পরিণত হয়েছিল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন