প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একদিকে পেটের ভেতর বুভুক্ষু জঠরানল, অন্যদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের তপ্ত পিচে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যান ও উদ্যত বন্দুকের নল। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মানুষগুলো, যাদের মাথার ঘামে তৈরি পোশাকে সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতির ঝুলি, আর দিনশেষে যাদের নিজেদের হাঁড়িতে জোটে না একবেলা ভাত।
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ন্যূনতম বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ একগুচ্ছ ন্যায্য দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ ও কর্মবিরতিকে কেন্দ্র করে চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে প্রশাসনিক কড়া নজরদারি ও বিজিবি-ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানোর খবর সংবাদপত্রের পাতায় শিরোনাম হলেও, ঢাকা পড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাত্যহিক জীবনের করুণ ও হৃদয়বিদারক বাস্তবতা।
মৌচাক এলাকার চার বাই চার ফুটের এক স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকেন সালমা বেগম (৩২)। পাশে শুয়ে আছে তাঁর চার বছরের তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভোগা সন্তান। সালমা ক্ষোভ ও চোখে জল নিয়ে বলেন, "সকাল থ্যাইকা রাত পর্যন্ত কাম করি। যে ট্যাহা পাই, তা দিয়া মাসের ১৫ তারিখের পর আর চলা যায় না। বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য গেটে তালা দেয়, দোকান দার আর বাকিতে চাল-ডাল দেয় না। বাচ্চাদের দুধ কিনে দেওয়া তো দূরের কথা, দু'বেলা ডাল-ভাত খাওয়ানো টাই এখন স্বপ্ন। আমরা তো কোনো রাজপ্রাসাদ চাই নাই, আমরা চাই একটু খাইয়া-পইড়া বাঁচনের অধিকার। সেই কথা বলতে গেলেই আমাদের মাথায় জোটে লাঠি আর গ্যাস।"
সবজি বাজার থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে শ্রমিক পরিবারগুলো দেনার দায়ে জর্জরিত। অনেক পরিবারে এখন দিনে একবেলা রান্না হয়। পুষ্টিকর খাবারের অভাব, নোংরা পরিবেশ এবং অপুষ্টিতে ভুগছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু। শ্রমিকের দাবি, বর্তমান বাজারে যে বেতন পাওয়া যায় তা দিয়ে মাসের অর্ধেক দিনও চলা অসম্ভব। বাঁচতে চাওয়ার আকুতি নিয়েই বাধ্য হয়ে তারা রাজপথে নামেন। রাজ পথে শ্রমিকদের কান্না আর ক্ষোভের বিপরীতে প্রশাসন গড়ে তুলেছে এক অভেদ্য নিরাপত্তা প্রাচীর। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর, মৌচাক, সাইনবোর্ড ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অবস্থান নেন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) আরিফ হোসাঈন জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জেলায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। আগে জেলায় ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন ছিল, নতুন করে আরও এক প্লাটুন যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট ১১ প্লাটুন বিজিবি মাঠে রয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ২১ জন থেকে বাড়িয়ে ২৫ জন করা হয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় কিছু শ্রমিক মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে যৌথ বাহিনী ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তাদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনের আড়ালে যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি বা কোনো ধরনের নাশকতার সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র প্রহরীরা অবস্থান করছে।
একদিকে মহাসড়কে যৌথ বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও নাশকতার আশঙ্কা, অন্যদিকে কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি হারানোর ভয়—এই দুইয়ের চাপে পড়ে সকালে অনেক শ্রমিককে দলবদ্ধ হয়ে কারখানায় ঢুকতে দেখা যায়। চোখে মুখে স্পষ্ট ছিল আতঙ্ক আর অনিচ্ছার ছাপ।
কাজে যোগ দিতে যাওয়া এক প্রবীণ শ্রমিক ক্ষোভের সাথে বলেন, "আমরাও শান্তি চাই, ভাঙচুর বা নাশকতা আমরা করি না। বাইরের কিছু লোক সুযোগ নেয়, আর দোষ হয় আমাদের। কারখানা বন্ধ হলে আমরাই না খাইয়া মরমু। কিন্তু কারখানা চালু রেখে মালিকরা যদি আমাদের পেটের খিদের কথা না বোঝেন, তাইলে এই ব্লেজার আর কড়া পুলিশ পাহারা দিয়া আমাদের কতদিন দাবায়ে রাখা যাবে?"
শিল্পাঞ্চলের মোড়ে মোড়ে টহল দিচ্ছে বিজিবির গাড়ি। সাজোয়া যানবাহনের গর্জন আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে মহাসড়কে সাময়িক শান্ত পরিবেশ বজায় থাকলেও শ্রমিক বস্তিগুলোতে জমে উঠেছে অসন্তোষের বারুদ। জীবনের নূন্যতম চাহিদা না মিটলে এই নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে কতদিন শিল্পাঞ্চলের ক্ষোভ চেপে রাখা সম্ভব, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন