প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় বঙ্গোপসাগরে যাদের নাম শুনলে আতঙ্কিত হতেন জেলেরা, সেই জলদস্যুদের অনেকেই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। যে হাতে একসময় ছিল অস্ত্র, সেই হাতে এখন কেউ ধরছেন দিনমজুরের কোদাল, কেউ চালাচ্ছেন গাড়ি। অন্ধকার জগৎ ছেড়ে আলোর পথে ফেরার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি মিলছে না তাদের। অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণের কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বোঝা ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২১৭ সাবেক জলদস্যুর জীবন।
জানা যায়, আত্মসমর্পণের পর তাদের অনেকেই সমাজের মূলধারায় ফিরেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ দিনমজুরি করে পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। তবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একের পর এক মামলা। একেকজনের বিরুদ্ধে ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। জীবিকার তাগিদে কাজ করবেন, নাকি মামলার হাজিরা দিতে আদালতে যাবেন—এমন সংকটে পড়েছেন তারা। মাসের ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত আদালতে যাতায়াত করতে হচ্ছে অনেককে। এতে কাজ হারানোর পাশাপাশি আর্থিক সংকটে পড়ছে তাদের পরিবার। অর্থাভাবে নিয়মিত হাজিরা দিতে না পারায় অনেকের পলাতক আসামি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
আত্মসমর্পণের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হত্যা ও ধর্ষণ মামলা ছাড়া অন্যান্য সাধারণ মামলা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে সাবেক জলদস্যুদের অভিযোগ, বাস্তবে সেই আশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেনি।
এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সাংবাদিক মীর মো. আকরাম হোছাইন। ২০১৪ সাল থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরের গভীরে জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ ও মধ্যস্থতা করেন তিনি। তার দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার ধাপে ৪৬টি দস্যু বাহিনীর ২১৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তারা জমা দেন দেশি-বিদেশি ৪২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ হাজার ২৫১ রাউন্ড গুলি এবং অস্ত্র তৈরির একটি লেদ মেশিন।
সাংবাদিক আকরাম হোছাইনের মতে, ‘শুধু আইন প্রয়োগ করে অপরাধের মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানবিক পুনর্বাসন।’ তিনি জলদস্যুদের পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তার অভিযোগ, যুগের পর যুগ ক্ষমতার পালাবদলে অসাধু রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে এসব মানুষকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছেন। জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করলেও তাদের পেছনের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আত্মসমর্পণের পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হলেও মামলার চাপ ও জীবিকার অনিশ্চয়তা সেই পথ কঠিন করে তুলছে। দিনমজুরি করে সংসার চালানো একজন মানুষকে মাসের অর্ধেক সময় আদালতে কাটাতে হলে তার পরিবারের ওপরও চাপ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আইনি জটিলতা নিরসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে তাদের কেউ কেউ আবার পুরোনো অপরাধজগতে ফিরে যেতে পারেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে উপকূলের জেলে ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন