প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রঙিন ও সাইকেডেলিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে ষাটের দশকের যুক্তরাষ্ট্রের হিপ্পি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক আবহকে তুলে ধরার জন্য পরিচিত শিল্পী পিটার ম্যাক্স মারা গেছেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর সোমবার ম্যানহাটনের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর বয়স ছিল ৮৮ বছর। বুধবার তাঁর পরিবারের মুখপাত্র মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পিটার ম্যাক্সের শিল্পকর্মে মহাকাশ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শান্তি ও প্রকৃতির নানা প্রতীক ফুটে উঠতো। উজ্জ্বল রং, মহাজাগতিক দৃশ্য, নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, শান্তির প্রতীক, প্রজাপতি, মেঘ ও ফুলের নকশা ছিল তাঁর কাজের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। ষাট ও সত্তরের দশকে তাঁর পোস্টার যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছিল।
পিটার ম্যাক্সের সংগীতজগতের অনেক তারকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। দ্য বিটলস, জিমি হেনড্রিক্স ও মিক জ্যাগারের মতো তারকারা ছিলেন তাঁর শিল্পকর্মের বিষয় এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও ছিল।
তাঁর শিল্পকর্ম শুধুমাত্র গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পিটার ম্যাক্স প্রায় ৭০ ধরনের পণ্যে নিজের শিল্প ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। তাঁর নকশা দেখা গেছে উড়োজাহাজ, ক্রুজ জাহাজ, বিছানার চাদর, চশমা, নারীদের সাঁতারের পোশাক, দাবার বোর্ডসহ নানা পণ্যে।
২০০৭ সালে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাক্স বলেছিলেন, "গ্যালারিতে কাজ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে পরিমাণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব, বাণিজ্যিকভাবে তাঁর শিল্প ব্যবহারের ফলে তার চেয়ে অনেক বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন তিনি।"
বাণিজ্যিকভাবে শিল্পকর্ম ব্যবহারের কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল। তবে ম্যাক্সের বক্তব্য ছিল, "মানুষ যাতে তাঁর শিল্প কিনতে পারে এবং তা থেকে আনন্দ পায়, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।" তাঁর মতে, শিল্পীর কাজ শুধু গ্যালারিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
ষাটের দশকের পর কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও ১৯৮৭ সালে নিউইয়র্কে একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে আবারও আলোচনায় ফেরেন ম্যাক্স। পরে তাঁর কাজে আরো ইমপ্রেশনিস্টিক ধাঁচ দেখা যায়। সংগীত তারকা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও বিশ্বনেতাদের পাশাপাশি স্ট্যাচু অব লিবার্টিও তাঁর শিল্পকর্মের বিষয় হয়ে ওঠে।
তিনি বিভিন্ন বড় ক্রীড়া আয়োজনেরও শিল্পী ছিলেন। পাঁচটি সুপার বোল, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ, ২০০৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শীতকালীন অলিম্পিক দল এবং ২০০০ সালের কেনটাকি ডার্বির জন্য অফিসিয়াল শিল্পী হিসেবে কাজ করেন।
এ ছাড়া কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৭৭, নরওয়েজিয়ান ক্রুজ লাইনের একটি জাহাজ এবং ন্যাসকার তারকা ডেল আর্নহার্টের একটি রেস কারও তিনি রং ও নকশায় সাজিয়েছিলেন।
২০০০ সালে কেবল টেলিভিশনের শপিং নেটওয়ার্ক কিউভিসিতে গিয়ে নিজের পোস্টার বিক্রিও করেন তিনি। ২০০০-এর দশকে তাঁর নিউইয়র্কের স্টুডিওতে কর্মীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায় এবং বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি ডলারের বিক্রি হতো বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
পিটার ম্যাক্সের পুরো নাম ছিল পিটার ম্যাক্স ফিঙ্কেলস্টাইন। ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে জন্ম তাঁর। জীবনের শুরুর দিকে চীন ও ইসরায়েলে থাকার পর তাঁর পরিবার নিউইয়র্কে স্থায়ী হয়। আর্ট স্কুলে তিনি বাস্তবধর্মী চিত্রকলা পড়লেও পরবর্তী কাজগুলোতে সেই ধারার তেমন ছাপ দেখা যায়নি।
১৯৬০-এর দশকের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে তাঁর শিল্পের বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৬৭ সালে ভিলেজ ভয়েস-এর এক সমালোচনায় তাঁর পোস্টারকে সময়, মহাকাশ ও বিবর্তন নিয়ে এক দূরদর্শী শিল্পীর কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও ম্যাক্সের ভক্ত ছিলেন। ম্যাক্স রিগ্যান প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরিতে স্ট্যাচু অব লিবার্টির একটি চিত্র উপহার দিয়েছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও একবার জানিয়েছিলেন, কলেজজীবনে তাঁর ডরমিটরির দেয়ালে ম্যাক্সের পোস্টার ছিল।
তবে তাঁর জীবন পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। ১৯৯৭ সালে নিজের শিল্পকর্ম বিক্রি থেকে ১১ লাখ ডলার আয় গোপনের অভিযোগে কর ফাঁকির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। তাঁকে দুই মাস হাফওয়ে হাউসে থাকতে এবং সমাজসেবামূলক কাজ করতে হয়। সেই কাজের অংশ হিসেবে শিশুদের শিল্প শেখাতেও তিনি সহযোগিতা করেন।
আরো পড়ুন
মিস ইউনিভার্সের মঞ্চ পেরিয়ে গুগলের চাকরিতে ফিরলেন উমাঙ্গা
২০১৯ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, পিটার ম্যাক্সের মধ্যে আলঝেইমার রোগের উপসর্গ এবং অগ্রসর ডিমেনশিয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তখন প্রায় চার বছর ধরে তিনি নিয়মিতভাবে ছবি আঁকছিলেন না।
মৃত্যুর সময় তিনি রেখে গেছেন মেয়ে লিব্রা ও ছেলে অ্যাডামকে। মেয়ের ভাষায়, "তাঁর বাবা শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু।" তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, অসাধারণ শিল্পকর্মের পাশাপাশি মানুষ পিটার ম্যাক্সের দয়া, কোমলতা এবং মানুষের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেও মনে রাখবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন