প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ও সংরক্ষণে ঘাটতির কারণে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে, অথচ কিছু ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এই বৈপরীত্য নির্দেশ করছে যে, ব্যাংক খাতের সংকট শুধুমাত্র অর্থের নয়, বরং আস্থা, সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার বড় সংকটও। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্বল ব্যাংকগুলো পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান খেলাপি ঋণ আদায় ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন, সেই সঙ্গে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য কম খরচে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূলধন সরবরাহ জরুরি হলেও ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সংস্কার ছাড়া নতুন মূলধনও পুরোনো ক্ষতি সামাল দিতে গিয়ে শেষ হয়ে যেতে পারে।
সিএসইআর-এর চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীমের মতে, ব্যাংক খাতে নতুন টাকা ঢালার মাধ্যমে সংকট সমাধান হবে না। ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও খেলাপি ঋণ আদায়ের কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে মূলধন জোগানের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং দ্রুত খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি বলছেন, "আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হলে ব্যাংকের পাশাপাশি পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।" সরকারের ব্যাংক সংস্কার পরিকল্পনায় দুর্বল ব্যাংককে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখার পরিবর্তে প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন ও সংকট সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তিনি বলেন, "আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা এবং বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।"
ব্যাংক খাত সংস্কার করতে গিয়ে যদি প্রকৃত উদ্যোক্তার ঋণপ্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উৎপাদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, একদিকে দুর্বল ও অনিয়মগ্রস্ত ব্যাংকের সংস্কার, অন্যদিকে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীর জন্য ঋণের দরজা খোলা রাখা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় সরাসরি কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে অর্থায়ন সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গভর্নর জানান, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার রোধে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’ এবং ‘মানি লোন কোর্ট অ্যাক্ট’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদের চাপ কমানো।
গভর্নর একই সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কম সুদের অর্থায়নের কথাও বলেছেন। ব্যাংকগুলোর নিষ্ক্রিয় আমানত ব্যবহার করে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করে এসএমই ও কৃষি খাতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন তহবিল তৈরির উদ্যোগ রয়েছে, যেখানে অনুদান এবং তুলনামূলক কম সুদের ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাত নিয়ে সিএসইআরের গবেষণা
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারম্যান, অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম সম্প্রতি দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট, চ্যালেঞ্জ এবং এ খাতের সম্ভাবনা নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। ঐ প্রতিবেদনে তিনি বলেন, ব্যাংক কোন সাধারণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে তার প্রভাব নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট দুর্বল হলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে আমানতকারী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতে। কারণ ব্যাংক হলো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনব্যবস্থা। ঋণ থেকে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে আয় ও কর্মসংস্থান, আবার আয় থেকে সঞ্চয় হয়ে অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসে। এই চক্রের কোথাও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব আর ব্যাংকের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন ঠিক এমন একটি জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর অর্থ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ এমন অবস্থায় আছে, যেখান থেকে স্বাভাবিকভাবে অর্থের পুনঃচক্রায়ন হচ্ছে না। তবে সংখ্যাটিকে আরও সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে। ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়া, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পুনর্মূল্যায়ন এবং সম্পদের মান যাচাইয়ের ফলে আগের তুলনায় ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি এখন বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। ডিসেম্বর মাসে তা ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই পতনের বড় অংশ এসেছে ব্যাপক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে, ঋণের প্রকৃত গুণগত উন্নতি থেকে নয়। ২০২৬ সালের মার্চে আবার অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জুনে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
এখানে মূল প্রশ্নটি তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত, সেখানে থামছে না। প্রশ্ন হলো, কেন একটি অর্থনীতি এত বড় পরিমাণ ঋণকে এত দীর্ঘ সময়েও পুনরুদ্ধার করতে পারল না? কেন ঋণ বিতরণের সময় ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলো না? কেন একটি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার পরও দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া গেল না? কেন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি কাঠামো ঝুঁকির সংকেত আগে ধরতে পারল না? আর কেন একটি ব্যাংকের মূলধন এতটা ক্ষয়ে যাওয়ার পরও সেটিকে কার্যত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট অর্থের সংকট যতটা, তার চেয়েও বেশি সংকট তার সুশাসন, প্রণোদনার কাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রথম আঘাত আসে ব্যাংকের মুনাফায়। এরপর প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ বা প্রভিশনিং করতে হয়। প্রভিশনিং করতে গিয়ে মুনাফা ক্ষয় হয়, আয় কমে, মূলধন দুর্বল হয়। মূলধন দুর্বল হলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ দুটোই কমে যায়। ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসার অর্থায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে ভালো ঋণও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ একদিকে ব্যাংককে দুর্বল করে, অন্যদিকে দুর্বল অর্থনীতি নতুন খেলাপি ঋণের জন্ম দেয়। এটি একটি চক্র। বাংলাদেশের সংরক্ষণ ঘাটতিও এই চক্রের গভীরতা দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে সংরক্ষণ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২২ লাখ কোটি টাকা। ছয় মাস আগে এই ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৯১ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বছরের প্রথম ছয় মাসেই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ না থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কতটা, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
মূলধনের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে পুরো ব্যাংকিং খাতের CRAR বা মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে Basel III framework অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণ বাফারসহ ন্যূনতম CRAR ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটটি ব্যাংকের ক্ষতি শোষণ করার সক্ষমতার ওপর বড় চাপের প্রতিফলন।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এক কথায় তারল্য সংকটে আছে বলা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের Monetary Policy Review অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় SLR-এর অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। Financial Stability Report-ও দেখিয়েছে, সামগ্রিকভাবে LCR ও NSFR নিয়ন্ত্রক সীমার ওপরে ছিল, যদিও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কিছু অংশে দুর্বলতা ছিল।
অর্থাৎ সমস্যা সবসময় টাকার মোট পরিমাণে নয়, টাকার অবস্থান, বণ্টন এবং আস্থার মধ্যেও বিদ্যমান। কিছু ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত তারল্য থাকতে পারে, কিন্তু দুর্বল ব্যাংকের প্রতি আন্তঃব্যাংক আস্থা কমে গেলে সেই তারল্য গোটা ব্যবস্থার মধ্যে সমানভাবে প্রবাহিত হয় না। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ঝুঁকি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে “তারল্য আছে” এবং “ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুস্থ” এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যায় না।
সাম্প্রতিক এই বাস্তবতা থেকেই বোঝা যায়, শুধু নতুন টাকা ঢাললেই ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভবপর নয়। বরং, সেই টাকা কোথায় যাবে এবং কত দিন টিকবে সেটিও বিবেচনা করতে হবে। একটি দুর্বল ব্যাংকে মূলধন জোগান দেওয়া হলেও যদি তার পুরোনো সুশাসন কাঠামো, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি, অপর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং অদক্ষ ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে নতুন মূলধন খুব দ্রুত পুরোনো ক্ষতি পূরণের কাজে ব্যয় হয়ে যেতে পারে।
উন্নত অর্থনীতির ব্যাংকিং সংকটগুলোর ইতিহাস এখানেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে তারল্য এবং মূলধন সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু সেখানেই থামেনি। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি বৃহৎ ব্যাংকের ওপর ব্যাপক Stress Test পরিচালনা করা হয়। তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষতি কত হতে পারে, ব্যাংকের কত মূলধন প্রয়োজন হবে এবং কোন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনা হয়। এর ফলে ১০টি ব্যাংককে অতিরিক্ত মূলধন জোগাড় করতে হয়। নভেম্বর ২০০৯-এর মধ্যে এই ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি Tier 1 Common equity বাড়িয়েছিল। আজও যুক্তরাষ্ট্রের Federal Reserve Stress Testing-কে ব্যাংক তদারকির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৬ সালের Stress Test-এ ৩২টি বৃহৎ ব্যাংককে কঠিন মন্দার পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় মোট ৭০৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য ক্ষতি ধরা হলেও সম্মিলিত মূলধন অনুপাত মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট কমে এবং ৩২টি ব্যাংক ন্যূনতম সাধারণ মূলধনের চাহিদার ওপরে থাকে। Federal Reserve-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর বড় ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সাধারণ মূলধন দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা কোনো এককালীন সরকারি সহায়তা নয়, বরং স্বচ্ছতা এবং মূলধন শৃঙ্খলা। ব্যাংকের প্রকৃত দুর্বলতা আগে শনাক্ত করা, সম্ভাব্য ক্ষতি আগেই হিসাব করা, ঘাটতি থাকলে মূলধন বাড়াতে বাধ্য করা এবং বাজারকে তথ্য দেওয়া। সংকটের সময়ে আস্থা ফেরে তখনই, যখন মানুষ জানে সমস্যাটা কোথায় এবং সেটি সমাধানের জন্য কী করা হচ্ছে।
সুইডেনের ১৯৯০-এর দশকের ব্যাংকিং সংকট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সম্পদের দাম পড়ে যাওয়ায় এবং ঋণ খেলাপি বাড়ায় কয়েকটি ব্যাংক গভীর সংকটে পড়ে। তখন সুইডিশ সরকার Nordbanken-কে পুনর্গঠন করে। ভালো সম্পদ ও খারাপ সম্পদ আলাদা করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ খারাপ সম্পদ Securum নামের একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। পরে Gota Bank-এর ক্ষেত্রেও অনুরূপ কাঠামো নেওয়া হয়। ১৯৯২ সালের সংকট মোকাবিলায় Bank Support Authority তৈরি করা হয়েছিল, যাতে পুরো পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধান প্রক্রিয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে।
সুইডেনের মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, ব্যাংককে রক্ষা করা আর ব্যাংকের মালিককে রক্ষা করা এক বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ আলাদা করা এবং টেকসই ও অটেকসই প্রতিষ্ঠানকে আলাদা পথে নেওয়া হয়েছিল। সরকারি সহায়তার আর্থিক বোঝাও পরবর্তী সময়ে খারাপ সম্পদ বিক্রি, লভ্যাংশ এবং বেসরকারিকরণের মাধ্যমে বড় অংশে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
ইউরোপের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আরও একটি শিক্ষা দেয়। ২০০৮ সালের পর ইউরোপীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনুৎপাদনশীল ঋণ বা NPL দীর্ঘ সময় বড় সমস্যা ছিল। ECB ২০১৭ সালে NPL মোকাবিলায় আলাদা তদারকি নির্দেশনা দেয় এবং ব্যাংকগুলোকে বাস্তবসম্মত NPL কমানোর কৌশল, সুশাসন কাঠামো, ঋণ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, সংরক্ষণ, হিসাব থেকে বাদ দেওয়া, জামানতের মূল্যায়ন এবং ঋণপত্র বা পোর্টফোলিও বিক্রির দিকে যেতে চাপ দেয়। সেখানে বিষয়টি কেবল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়নি; তদারকি সংস্থা, আদালত, আইনি কাঠামো এবং বিপর্যস্ত সম্পদের বাজার মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল।
ফলাফলও পরিমাপযোগ্য। ECB-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরো এলাকার বড় ব্যাংকগুলোতে NPL অনুপাত ২০২৫ সালের শেষে ২ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমেছে। ২০১৫ সালে এই অনুপাত ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। একই সময়ে সম্মিলিত CET1 ratio দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং liquidity coverage ratio ১৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ECB জানিয়েছে, NPL কমার পেছনে ঋণ পুনরুদ্ধার, সম্পদ বিক্রি, securitisation এবং ঋণগ্রহীতার স্বাভাবিক পরিশোধ অবস্থায় ফিরে আসার মতো একাধিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে।
অর্থাৎ উন্নত অর্থনীতির ব্যাংক খাত শক্তিশালী হয়েছে কোনো একক “জাদুকরি নীতি”-এর কারণে নয়। তারা সংকটের হিসাব লুকায়নি, দুর্বলতা সময়মতো মেপেছে, মূলধন ঘাটতি পূরণ করেছে, খারাপ সম্পদ আলাদা করেছে, ঋণ পুনরুদ্ধারের কার্যকর বাজার তৈরি করেছে, ব্যাংক সংকট-সমাধানের কাঠামো শক্তিশালী করেছে এবং ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জবাবদিহি বাড়িয়েছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এমন প্রতিষ্ঠানকে অনির্দিষ্টকাল বাঁচিয়ে রাখার বদলে সুশৃঙ্খলভাবে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। Financial Stability Board-এর আন্তর্জাতিক কাঠামোও একই নীতির ওপর দাঁড়িয়ে: শেয়ারহোল্ডার ও অনিরাপদ পাওনাদারের মাধ্যমে ক্ষতি শোষণ, আমানতকারীর সুরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা সচল রাখা এবং করদাতার ওপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা না চাপানো।
বাংলাদেশও সংস্কারের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। Bank Resolution Act, 2026 এখন বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকটাপন্ন ব্যাংকের পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানের জন্য আরও স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের Bank Restructuring & Resolution Unit-এর দায়িত্বের মধ্যে পুনর্মূলধনীকরণ, সম্পদ ও দায় হস্তান্তর, সম্পদ-দায় গ্রহণ, একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ, বেইল-ইন, পুনর্গঠন কিংবা অবসানের মতো কৌশল নিয়ে কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সময়ে বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পৃথক আইনও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে খেলাপি ও অবলোপনকৃত সম্পদের দ্বিতীয় বাজার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের কাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বাস্তব সংকট-সমাধান প্রক্রিয়াতেও গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে টেকসইভাবে পরিচালনার অযোগ্য ঘোষণা করে সংকট সমাধান প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে কারণগুলো উল্লেখ করেছে তার মধ্যে ছিল বড় মূলধন ঘাটতি, উচ্চ শ্রেণিকৃত সম্পদ, তারল্য চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা।
তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এই সংস্কারগুলো যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে তা খেয়াল রাখা। খেলাপি ঋণের সমস্যায় আমাদের বহু বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা নতুন করে সময় দেওয়া কোনো সমস্যাকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে, কিন্তু ঋণ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করে না। ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে; তারপরও ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই ব্যবধানটি নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
তাহলে বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সমন্বিত ব্যাংক খাত পুনর্গঠন কৌশল প্রয়োজন। প্রথম ধাপে প্রতিটি দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদমান নির্ধারণ করতে হবে। Asset Quality Review-এর ফলাফলকে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ মূলধন পরিকল্পনা, ব্যবসায়িক কাঠামো এবং সংকট-সমাধানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে টেকসই কিন্তু মূলধনস্বল্প ব্যাংককে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ মূলধন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা দিতে হবে। তৃতীয় ধাপে দীর্ঘমেয়াদে অটেকসই ব্যাংকের জন্য একীভূতকরণ, হস্তান্তর, অস্থায়ী সেতু-ব্যাংক, অবসান বা অন্যান্য সংকট-সমাধান ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। চতুর্থ ধাপে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারকে আলাদা পেশাদার কার্যক্রম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং বিপর্যস্ত সম্পদের জন্য কার্যকর দ্বিতীয় বাজার তৈরি করতে হবে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে মূলধনস্বল্প ব্যাংকের জন্য মূলধন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল পুনর্গঠন ও সংকট-সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এর সঙ্গে সুশাসন সংস্কারকে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকের MD ও CEO-দের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য ১০০ নম্বরের কাঠামো করেছে, যেখানে আর্থিক সক্ষমতা ও তারল্যে ২৫, সম্পদের মানে ২৫ এবং সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেও আছে ২৫ নম্বর। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়ন কাঠামোও এখন স্পষ্টভাবে বলছে, ব্যাংকের সফলতাকে কেবল মুনাফা দিয়ে মাপা যাবে না। ঋণ দেওয়ার সময় যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের দায় কোথায় থাকবে, সেটিও পরিষ্কার করতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনার প্রণোদনা যদি থাকে দ্রুত ঋণ বিতরণে, কিন্তু ঋণ ফেরতের মান বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদের মানের দায় যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে সমস্যা আবার ফিরে আসবে। তাই ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের সঙ্গে ঋণ পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ, ঝুঁকির ঘনত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের মতো সূচক যুক্ত হওয়া জরুরি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে নজরদারি করতে হবে, কিন্তু প্রতিদিনের ঋণ সিদ্ধান্ত ও পরিচালন জবাবদিহির সীমারেখাও স্পষ্ট থাকতে হবে।
একই সঙ্গে তদারকির ধরন বদলাতে হবে। শুধু গত বছরের হিসাবের খাতা দেখে ব্যাংকের স্বাস্থ্য মাপলে হবে না। Stress Test, আগাম সতর্কতা সূচক, ঝুঁকির ঘনত্ব, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ, বড় অঙ্কের ঋণ, তারল্যের অমিল এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে যাচ্ছে এবং IMF-এর সঙ্গে আলোচনায়ও এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি ভারসাম্যও জরুরি। ব্যাংক খাত পরিষ্কার করতে গিয়ে এমন কঠোরতা তৈরি করা যাবে না, যাতে প্রকৃত উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা কিংবা উৎপাদনশীল খাত ঋণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবার “উদ্যোক্তা বাঁচানোর” নামে অকার্যকর ঋণগ্রহীতাকে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখা যায় না। যে ব্যবসা মৌলিকভাবে টেকসই, তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে। যে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রাখে না, সেখানে দ্রুত প্রকৃত ক্ষতি স্বীকার ও ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। অর্থাৎ লক্ষ্য হবে ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করা নয়, বরং ঋণ সমস্যার সমাধান করা। শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের সংকটের সমাধান আরেকটি সরকারি সহায়তা দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু সরকারি সহায়তা দিয়ে শেষ হতে পারে না। মূলধন দিতে হবে, তারল্যের নিরাপত্তা দিতে হবে, আমানতকারীর আস্থা রক্ষা করতে হবে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন ব্যাংকের ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো বদলানো। কারণ খারাপ ঋণের পেছনে যদি ভুল প্রণোদনা থাকে, দুর্বল তদারকি থাকে এবং দায়বদ্ধতার ঘাটতি থাকে, তাহলে নতুন মূলধন পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন স্তর তৈরি করবে। ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হলে রাষ্ট্রের অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়ে। ব্যাংকের তারল্য কমলে ব্যবসার চলতি মূলধন সংকুচিত হয়। ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়লে ঋণের দাম বাড়ে। ঋণের দাম বাড়লে বিনিয়োগ কমে। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে। আর কর্মসংস্থান কমলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে। তাই ব্যাংক সংস্কার কোনো খাতভিত্তিক সংস্কার নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের সামনে এখন তাই একটি বড় সিদ্ধান্তের সময়। আমরা কি খেলাপি ঋণের সংখ্যাকে কম দেখাতে চাই, নাকি সমস্যার প্রকৃত আকার স্বীকার করে সমাধান করতে চাই? আমরা কি দুর্বল ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করব, নাকি টেকসই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী এবং অটেকসই প্রতিষ্ঠানকে সুশৃঙ্খল সংকট-সমাধানের পথে নেব? আমরা কি শুধু তারল্য জোগাব, নাকি তারল্য কোথায় এবং কেন আটকে আছে সেটিও খুঁজব? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ব্যাংকে মূলধন ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি আমরা কি ব্যাংক পরিচালনার সংস্কৃতিটিও বদলাতে পারব?
বিশ্বের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। ব্যাংক সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসাবের খাতার শেষ লাইনে লেখা যায় না। তার শুরু হয় সঠিক ঋণ সিদ্ধান্তে, শক্ত সুশাসনে, সময়মতো ঝুঁকি শনাক্তকরণে এবং সমস্যাকে আড়াল না করার সাহসে। মূলধন ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে পারে, তারল্য ব্যাংককে চলতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসনই একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সেই সত্যটিকে নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য থাকতে হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি নতুন খেলাপি ঋণ তৈরির কারণও বন্ধ করতে হবে। মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে, কিন্তু কেন মূলধন ক্ষয় হলো সেই প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে সহায়তা দিতে হবে, কিন্তু সেই সহায়তার সঙ্গে সংস্কার, জবাবদিহি ও সময়সীমা যুক্ত করতে হবে। তাহলেই ব্যাংক খাত আবার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন