প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একদিকে মিলনায়তনে কবিতা ও গানের সুর ভেসে আসছিল, অন্যদিকে বাইরে ক্যানভাসে ফুটে উঠছিল ঘরছাড়ার যন্ত্রণা, পথের ক্লান্তি এবং বেঁচে থাকার আকুতি। ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একাত্তরের শরণার্থী জীবনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে এমন একটি আবেগঘন বিকেলের সাক্ষী হলো।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাদুঘরের মিলনায়তনে স্মারক অনুষ্ঠান ‘৭১-এর শরণার্থী জীবন’ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর আয়োজন করে স্মৃতি ৭১। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিন্নাত আরা হক।
অনুষ্ঠানের সামগ্রিক আয়োজন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফারুক এইচ খান একাত্তরের শরণার্থী সংকট এবং মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে সীমান্ত পেরোনো মানুষের মানবিক বিপর্যয় কিভাবে গিন্সবার্গের কবিতায় বিশ্বজনীন ভাষা পেয়েছিল।
এরপর ১৫২ লাইনের এই কবিতা থেকে নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করেন মুস্তাক আহমেদ ও নাজনিন পাপ্পু। কবিতার ভাষায় উঠে আসে শরণার্থীদের ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও আশ্রয়ের আকুতি। মৌসুমি ভৌমিকের গাওয়া বহুল পরিচিত গানটি পরিবেশন করেন নবনিতা হাবিব চৌধুরি।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘একাত্তরের শরণার্থী’ প্রদর্শিত হয়। পর্দার বাস্তবতার পাশাপাশি মঞ্চে সরাসরি নিজেদের স্মৃতি তুলে ধরেন একাত্তরের প্রত্যক্ষদর্শীরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জুগিয়েছিলেন যে শিল্পীরা, তাদের মঞ্চে নিয়ে আসেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন উত্তরীয় পরিয়ে তাদের সম্মান জানান।
স্মৃতিচারণে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় আবৃত্তিশিল্পী ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য। তিনি একাত্তরে শরণার্থী মিছিলে নিজের মাকে হারানোর ব্যক্তিগত স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, যুদ্ধের বৃহৎ ইতিহাসের আড়ালে একটি পরিবারের বিচ্ছেদ আর একজন সন্তানের শোক চাপা পড়ে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও প্রকাশক মফিদুল হক বলেন, একাত্তরের শরণার্থী অভিজ্ঞতাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তার ভাষ্য, দেশ ছাড়ার সেই অভিজ্ঞতা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি লাখো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, স্মৃতি ও ক্ষতির ইতিহাস।
কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ মুক্তিযুদ্ধের সময় গানকে মানুষের মনোবল ধরে রাখার অন্যতম শক্তি হিসেবে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেই সময়ের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে গান ছিল প্রতিরোধেরই এক রূপ।
শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শঙ্কর লাল সাহা ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ফারাজিও। তাদের স্মৃতিচারণে ফিরে আসে দেশ ছাড়ার যাত্রা, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের দিনে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
‘স্মৃতি ৭১’-এর মাহবুব জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গান, কবিতা ও শিল্প কেবল বিনোদন ছিল না; ট্রেনিং সেন্টারে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে শিল্পীরা তাদের মনোবল ধরে রাখার মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন।
মিলনায়তনে যখন স্মৃতি ও কথনে ফিরে আসছিল একাত্তর, তখন বাইরে চলছিল আরেক শিল্পযাত্রা। দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীরা ক্যানভাসে তুলে ধরছিলেন শরণার্থী জীবনের নানা খণ্ডচিত্র। যুদ্ধ, দেশত্যাগ, পথের ক্লান্তি, আশ্রয় এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাদের তুলিতে নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আবৃত্তি, গান, প্রামাণ্যচিত্র, প্রত্যক্ষ বয়ান এবং চিত্রকলার এই সমন্বয় একাত্তরের শরণার্থী সংকটকে কেবল অতীতের ঘটনা হিসেবে নয়, মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখার একটি পরিসর তৈরি করে।
১৯৭১ সালে শরণার্থী সংকট প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থেকেই অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। পরবর্তীকালে কবিতাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক স্মৃতির অন্যতম পরিচিত দলিল হয়ে ওঠে। স্মৃতি ৭১-এর এই আয়োজন সেই ইতিহাসের কাছেই ফিরে গিয়ে একাত্তরের শরণার্থীদের জীবন, কণ্ঠ এবং স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন