প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে নানা প্রান্ত থেকে সমর্থকরা উত্তর আমেরিকায় উপস্থিত হতে শুরু করেছেন। কিন্তু পূর্ব আফ্রিকার ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আয়োজক দেশগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য একটি সতর্ক অবস্থান তৈরি করেছে।
কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ভাইরাসটির বিরল বুন্ডিবুগিও ধরনটির প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রথমবারের মতো, ১৫ মে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) এই প্রাদুর্ভাব জানানো হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে অন্তত ৪৮৮ জনের মধ্যে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোগটি প্রতিবেশী উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এখন পর্যন্ত উগান্ডায় ১৯টি সংক্রমণ ও দুটি মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। সীমান্তবর্তী সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশটি কঙ্গো ডিআরের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে, যা সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীদের জন্য কিছু সমস্যা সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) সতর্ক করেছে যে বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি আরও বিস্তৃত হয়ে ইতিহাসের অন্যতম বড় ইবোলা মহামারিতে পরিণত হতে পারে, যা ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারির সমতুল্য হতে পারে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে ১০ লাখেরও বেশি সমর্থকের উত্তর আমেরিকায় ভ্রমণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষ টুর্নামেন্ট চলাকালে ইবোলার সংক্রমণ রোধে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
তিনটি আয়োজক দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘ইবোলা ভাইরাসের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আফ্রিকান অঞ্চলগুলো থেকে আগত ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক ভ্রমণ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, গত ২১ দিনের মধ্যে ডিআরসি, উগান্ডা বা দক্ষিণ সুদান সফর করেছেন এমন কোনো অ-নাগরিককে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। পরে এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী বাসিন্দাদের (গ্রিন কার্ডধারীদের) ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে, যদি তারা ওই দেশগুলোতে গত ২১ দিনের মধ্যে অবস্থান করে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ওয়াশিংটন ডালেস ও হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন আটলান্টা বিমানবন্দর, আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আসা যাত্রীদের জন্য কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালু করেছে।
কানাডার জনস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ডিআরসি, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের বাসিন্দাদের জন্য সাময়িকভাবে ৯০ দিনের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এদিকে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে অবস্থানরত কানাডীয় নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা এবং অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে যাদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদেরও ২১ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এই নিয়ম ৩০ মে থেকে কার্যকর হয়েছে।
মেক্সিকোর স্বাস্থ্য সচিব বিমানবন্দরগুলোতে আরও কঠোর ইবোলা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে জনগণকে ডিআরসি সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ এবং সেখান থেকে আগতদের ২১ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বেলজিয়ামে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ডিআর কঙ্গো
১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া ডিআর কঙ্গো ইবোলা পরিস্থিতির কারণে নিজ দেশে পরিকল্পিত প্রস্তুতি ক্যাম্প বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। দলটি বর্তমানে বেলজিয়ামে অবস্থান করছে।
হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি ২৩ মে ইএসপিএনকে জানান, কঙ্গোর প্রতিনিধিদলকে বেলজিয়ামে একটি 'বাবল' পরিবেশে থেকে ২১ দিনের আইসোলেশন মেনে চলতে হবে, অন্যথায় তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি নাও পাওয়া যেতে পারে।
ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় স্পেনে চিলির বিপক্ষে নির্ধারিত প্রস্তুতি ম্যাচ বাতিল হওয়ায় দলটির বিশ্বকাপ প্রস্তুতি আরও বিঘ্নিত হয়েছে।
দক্ষিণ স্পেনের লা লিনিয়া দে লা কনসেপসিওনের মেয়র হুয়ান ফ্রাঙ্কো বলেছেন, ‘আমি ৯ জুন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও চিলির মধ্যে ম্যাচ আয়োজন নিষিদ্ধ করার আদেশে স্বাক্ষর করেছি।’
তবে কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে ম্যাচটি আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আমি শুধু বলতে পারি, আমরা সব সময় পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত। যা-ই ঘটুক না কেন, আমরা এসব পরিস্থিতির সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারব।’
বিশ্বকাপ চলাকালে পূর্ব আফ্রিকার এই দলটি টেক্সাসের হিউস্টনে ঘাঁটি গড়বে। ১৭ জুন তারা গ্রুপ ‘কে’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের মুখোমুখি হবে।
এরপর ২৪ জুন মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় কলম্বিয়ার বিপক্ষে এবং ২৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় উজবেকিস্তানের বিপক্ষে তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংক্রমণ পর্যবেক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা
বিশ্বকাপ চলাকালে সংক্রামক রোগের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ করবে বোস্টন ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন এমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস।
তাদের বিইএসিওএন (বায়োথ্রেটস ইমার্জেন্স অ্যানালাইসিস অ্যান্ড কমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক) কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ‘জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের, অংশগ্রহণকারীদের এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে অবহিত, নিরাপদ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির এক ধাপ এগিয়ে রাখা।’
এ ছাড়া ন্যাশনাল স্পেশাল প্যাথোজেন সিস্টেম (এনএসপিএস) সম্প্রতি একটি মহড়া পরিচালনা করেছে, যেখানে বিশ্বকাপ চলাকালে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে, তার অনুশীলন করা হয়।
তাদের কাল্পনিক পরিস্থিতি ছিল বিশ্বকাপের সময় মধ্যপ্রাচ্য শ্বাসতন্ত্র সিনড্রোম (এমইআরএস) ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা।
এনএসপিএসের মতে, এই মহড়া ‘সময়সম্মত পদক্ষেপ, সমন্বিত উদ্যোগ এবং ব্যাপক পরিকল্পনার গুরুত্ব’ তুলে ধরেছে।
সমর্থকদের জন্য ঝুঁকি ‘খুবই কম’
এতসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বকাপ দেখতে উত্তর আমেরিকায় যাওয়া সাধারণ সমর্থকদের জন্য ঝুঁকি খুবই কম।
লন্ডনের কিংস কলেজের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অলিভার জনসন রয়টার্সকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সাধারণ বিশ্বকাপ দর্শকদের জন্য ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ইবোলার সংক্রমণ কার্যত কখনো বড় আকার ধারণ করেনি। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দেখা গেলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।’
জনসনের ভাষায়, ‘এর কারণ হলো ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। সাধারণত গুরুতর অসুস্থ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসাদের দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা (কন্টাক্ট ট্রেসিং) সাধারণত ভালো থাকে। ফলে কোনো সংক্রমণ দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।’
তিনি বিশ্বকাপগামী সমর্থকদের নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন