১২:৪৩ পি.এম
॥ দিদারুল আলম ॥
ঢাকা, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ : সম্পত্তি দান করার পরও জীবদ্দশায় তা ভোগ ও ব্যবহার করার পূর্ণ আইনি অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রেখে দেশে সম্পত্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। জাতীয় সংসদে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ পাস হওয়ার মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে এই নতুন দিগন্ত।
নতুন আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি কাঠামোয় ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে একটি নতুন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, সম্পত্তির চূড়ান্ত মালিকানা গ্রহীতার অনুকূলে হস্তান্তর হলেও দাতা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন ওই সম্পত্তি নিজের মতো ভোগদখল ও ব্যবহার করার অধিকার রাখবেন।
আরও পড়ুন: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি: প্রতিমন্ত্রী টুকু
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে জানিয়েছেন, ‘সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আমরা একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছি। এই আইন দ্বারা হেবা কিংবা গিফট বা অন্য কোনোভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরকে বাধাগ্রস্ত করবে না বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই আইনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের একটি বিকল্প করোনারি আনছি। কেউ যদি হেবা করতে চান, হেবা করতে পারবেন। সেখানে কোনো বাধা নেই। কেউ যদি অন্য আইনে সম্পত্তি ডিল করতে চান, সেটাও করতে পারবেন। সেখানেও কোন বাধা নেই।’
ইসলামী আইনের সঙ্গে বৈপরীত্যের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, ‘ইসলামিক ল’ বা হেবা আইনের ওপর কারো হাত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমরা সেখানে হাত দিইনি। আমরা হেবাকে সংরক্ষণ করেছি। আইনের মধ্যে এক্সপ্রেসলি সেটা বলেছি।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘একটা গ্রুপ এটা নিয়ে পলিটিক্স করার চেষ্টা করছে। এগুলো সাধারণ মানুষ গ্রহণ করছে না। সাধারণ মানুষ এই আইনটাকে খুব পজিটিভলি দেখছে।’
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগে আইনের ব্যত্যয় হয়নি: অ্যাটর্নি জেনারেল
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬-কে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া বাসস’কে জানিয়েছেন, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আইনটির সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি, সন্তান-সন্ততি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। আইনটিতে এ বিধান সময়োপযোগী সংশোধনী।
সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত সংশোধনী আইনটি যথাযথভাবে যেন সর্বত্র প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পিতা-মাতার করুণ পরিণতির বহু ঘটনা আমরা দেখেছি।
আরও পড়ুন: রাশেদ খাঁন: হাজার ডিসেম্বর গেলেও হাসিনা ফিরবেন না
পিতা-মাতার প্রতি নিজ সন্তানদের অবজ্ঞার বহু নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে।
একলাছ ভূঁইয়া বলেন, আমাদের দেশ চলে সাংবিধানিক আইনের অধীনে। দেশে প্রচলিত ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত পুরনো আইনটির সংশোধন করে জাতীয় সংসদ যে বিধান নিশ্চিত করেছে, এজন্য সরকারকে স্বাগত জানান তিনি।
সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট ছিদ্দিক উল্লাহ্ মিয়া বলেন, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর বা দানে দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। দাতা তার জীবদ্দশায় সম্পত্তির পূর্ণ ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে অক্ষুন্ন রেখেই পরবর্তী প্রজন্মের অনুকূলে মালিকানা হস্তান্তর করতে পারবেন।
বিশিষ্ট এই আইনজীবী বলেন, সংশোধিত আইনটি সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এটি পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের ভিতকে মজবুত করবে। পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্বহীন, অমানবিক আচরণ পরিহার ও সতর্ক করতে এ আইনটি সময়োপযোগী এবং আইনি ও সামাজিক সঙ্কটের টেকসই সমাধান।
আরও পড়ুন: ১৩ জেলায় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক পদে ১৩ উপসচিবের পদায়ন
তিনি বলেন, পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং প্রবীণ বয়সে নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-এই দ্বৈত সংকটের একটি সুষম ও আইনি সমাধান দেবে এই বিধান।
জাতীয় সংসদে পাস ও রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর গত ৮ সেপ্টেম্বর আইনটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। এটি ২০২৬ সালের ১০৫ নং আইন, যা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন তথা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২ এর অধিকতর সংশোধনকল্পে প্রণীত আইন।
আইনটি সংশোধন করে প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর অধীন জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান সংক্রান্ত বিধান সুনির্দিষ্ট করা এবং ওই ভোগাধিকার সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়। আইনটি ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আইনটির ধারা ১২২ক-জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে বলা হয়েছে, এই আইনে বা বর্তমানে বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো দাতা তার জীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার নিজের জন্য সংরক্ষণ করে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করলে, সেই দান বৈধ হবে।
আরও পড়ুন: শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
উপ-ধারা (১)-এর অধীনে দান বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো-এই ধরনের দান করতে পারবেন পিতা বা মাতা তার সন্তান বা সন্তানদেরকে; দাদা-দাদি বা নানা-নানি তার নাতি বা নাতনিকে; সন্তান তার পিতা-মাতা বা দাদা-দাদিকে; নাতি-নাতনি তার দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে; অথবা স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে। তবে, দানটি যদি স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত হয়, তাহলে এই ধারার অধীনে ঘোষণা করে এবং রেজিষ্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে দান করতে হবে।
দাতার জীবদ্দশায় যদি গ্রহীতা মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তিটি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। তবে সম্পত্তির ওপর দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে এবং সম্পত্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, দানগ্রহীতা মারা গেলেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার নষ্ট হবে না।
এই ধারায় সম্পত্তি হস্তান্তরকে এই আইনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র বা পৃথক ধরনের হস্তান্তর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ফলে এই আইন বা অন্য কোনো প্রচলিত আইনে স্বীকৃত সাধারণ দান, হেবা অথবা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা সীমিত, ক্ষুণ্ন বা প্রভাবিত হবে না।
ধারা ১২২খ-জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো দান একবার নিবন্ধিত হয়ে গেলে সাধারণভাবে তা অপ্রত্যাহারযোগ্য হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে- দাতা ও গ্রহীতা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দানের ফলে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থা করতে পারবেন, যদি তা প্রয়োজন হয়-আর্থিক প্রয়োজনের কারণে; চিকিৎসাগত প্রয়োজনের কারণে; শিক্ষাগত প্রয়োজনের কারণে; পারিবারিক প্রয়োজনের কারণে; অথবা অন্য কোনো প্রকৃত ও যৌক্তিক প্রয়োজনের কারণে। অথবা কোনো পক্ষের সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলে-যেমন-সে অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে; নিখোঁজ থাকলে; মানসিকভাবে অক্ষম হলে; আইনগত অক্ষমতা থাকলে; অথবা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণ থাকলে, অন্য পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জেলা জজ ধারা ১২২ক-এর অধীনে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্য কোনোভাবে ব্যবস্থাপনার অনুমতি দিতে পারবেন, যদি উপ-ধারা (১)(ক)-এ বর্ণিত প্রয়োজনীয়তার কোনো একটি বিদ্যমান থাকে। জেলা জজের আদেশের আগে করণীয় (২) উপ-ধারা (১)-এর (খ) দফার অধীনে কোনো আদেশ দেওয়ার আগে জেলা জজকে-(ক) সম্পত্তি বা সংশ্লিষ্ট অধিকারে স্বার্থ রয়েছে এমন সব ব্যক্তিকে নোটিশ দিতে হবে (খ) প্রয়োজন মনে করলে যথাযথ তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে হবে; এবং (গ) নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি সুষম আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা। বিদ্যমান পারিবারিক সংকট দূর করার পাশাপাশি প্রবীণদের আত্মমর্যাদা ও আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই নতুন আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন