প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নেপালের চিতওয়ান জেলার দেবঘাট বন এখন আর একটি নিরিবিলি সবুজ এলাকা নয়। আকস্মিক বন্যা ও হড়পা বানের পর এই বনটি পরিচয়হীন মরদেহের অস্থায়ী কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। স্বজনেরা যখন নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজে ছুটছেন, তখন কর্তৃপক্ষ একের পর এক মরদেহ দাফন করতে বাধ্য হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বুধবার নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর চিতওয়ানের দেবঘাট বনে এসব মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। দুর্যোগকবলিত রসুয়া অঞ্চলের উপত্যকাগুলো থেকে বনাঞ্চলটির দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।
কয়েক দিন আগে দেবঘাটের বনপথ ছিল সকালের হাঁটার জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান। বর্তমানে সেখানে অস্থায়ী গণকবর তৈরি করা হয়েছে। পানিতে ভেসে আসা এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া যেসব মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলোই সেখানে দাফন করা হচ্ছে।
চিতওয়ানের ভারতপুরের চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার গণেশ আর্যাল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, "মরদেহ দ্রুত পচে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।"
শনিবার দেবঘাটের বনাঞ্চলে ৯৬টি পরিচয়হীন মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রবিবার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মরদেহের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছেন প্রায় ১০০ জন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তা। তারা মরদেহের তথ্য নথিভুক্ত করছেন, ছবি তুলছেন, স্বজনদের শনাক্তকরণে সহায়তা করছেন এবং দাফনের জন্য মরদেহ প্রস্তুত করছেন।
প্রতিটি মরদেহ কোথায় দাফন করা হয়েছে, সেটিও বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করছে কর্তৃপক্ষ। কবরের ওপর ও মাটির নিচে শনাক্তকরণ চিহ্ন রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থানের তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে যাতে সেটি খুঁজে বের করা যায়, সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পরিচয়হীন মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেছে নেপালি কর্তৃপক্ষ। পরিবারের দাবি, সরকারি নথি কিংবা জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে এসব দেহাবশেষ উত্তোলন করা সম্ভব হবে।
এ কাজে নেপালের সঙ্গে ভারত ও চীনের দলও কাজ করছে। ভারত ইতিমধ্যে একটি ফরেনসিক দল পাঠিয়েছে, যারা নেপালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করবে। চীনের একটি দলের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে নেপাল।
এদিকে চিতওয়ানের ভারতপুর হাসপাতালেও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালের একটি অস্থায়ী মর্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহ রাখা হচ্ছে। মর্গটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০টি মরদেহ হলেও সেখানে প্রায় ১২৫টি মরদেহ পড়ে ছিল। অনেক মরদেহই কয়েক দিন বন্যার পানিতে থাকার কারণে পচে গেছে।
মরদেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা পরিদর্শক অনিল থাপা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, "উদ্ধার করা মরদেহের অর্ধেকের বেশি শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক মরদেহের মুখও চেনার উপায় নেই।"
মর্গের বাইরে থেকেই পচা মরদেহের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মরদেহ সামলাতে থাকা পুলিশ ও হাসপাতালের কর্মীদের অনেকেই শুধু সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করছিলেন।
হাসপাতাল থেকে কয়েকশ মিটার দূরের চিতওয়ান এক্সপো সেন্টারেও স্বজনদের ভিড় বাড়ছে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে আসছেন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ পাওয়ার আশায় একটি হলের বাইরে দুই শতাধিক মানুষ অপেক্ষা করছিলেন।
অনেকের সঙ্গে ছিল ব্যাগ ও লাগেজ। এতে বোঝা যায়, নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে তারা দূরবর্তী এলাকা থেকে সেখানে এসেছেন। কয়েকটি পরিবার জানিয়েছে, তারা আগের দিনই সেখানে পৌঁছালেও এখনো হলের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়নি।
এদিকে মরদেহ শনাক্তের অপেক্ষায় থাকা আরেকটি পুরোনো একতলা ভবনও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনের বাইরে নেপাল রেড ক্রসের একটি সহায়তা ডেস্ক এবং পুলিশের নিবন্ধনকেন্দ্র বসানো হয়েছে।
মরদেহ পচে যাওয়ার গতি কমাতে সেখানে ড্রাই আইস, এয়ার কন্ডিশনার ও একটি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কুলিং ইউনিট চালু রাখা হয়েছে। ভবনের ভেতরে বাঙ্ক বেডের ওপর সারি করে রাখা হয়েছে মরদেহের ব্যাগ।
এর মধ্যেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একটি গাড়িতে করে একসঙ্গে ১৩টি মরদেহ ওই অস্থায়ী মর্গে আনা হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে সেখানে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সও অবস্থান করছিল। বাইরে অপেক্ষা করছিল আরও একটি গাড়ি।
মরদেহ আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে। তাদের একটাই অপেক্ষা, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাদের নিখোঁজ প্রিয়জন আছেন কি না।
মরদেহ সামলাতে থাকা কর্মীদের ওপরও পড়ছে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রভাব। পরিদর্শক অনিল থাপা বলেন, "সেখানে কাজ করতে এসে তার খাবারের কথাই মনে হয় না। এমনকি পানি পান করতেও ইচ্ছা করে না।"
গত বুধবার হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী উপত্যকাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দুর্যোগের পর শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র:
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন