প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চীনে তৈরি নতুন রোবট ও বিদ্যুৎ ইনভার্টার আমদানির ওপর মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এর লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের সম্প্রসারণকে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা।
মঙ্গলবার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) এ সংক্রান্ত ব্যবস্থা প্রকাশ করে। নতুন নিয়মে চীনের তৈরি নতুন মানবসদৃশ রোবট এবং চার পায়ের রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সংযুক্ত বিদ্যুৎ ইনভার্টারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এসব ইনভার্টারের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস ও ব্যাটারিকে বিদ্যুৎ গ্রিড এবং ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এর আগে রয়টার্স এ নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশ করেছিল।
এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, চীনের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, তথ্য চুরি ও সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ শৃঙ্খলকে নিরাপদ রাখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করতেও উৎসাহ দিতে চায় তারা।
এফসিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, 'এসব যন্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে। এগুলো এমন সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।'
এফসিসির চেয়ারম্যান ব্রেনডান কার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে এফসিসি তার দায়িত্ব পালন করে যাবে।' ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাস বলেছে, বেইজিং 'দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক মতামতের প্রতি গুরুত্ব দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানাচ্ছে।'
'একই সঙ্গে তারা বলেছে, 'চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে।' দূতাবাস আরো জানায়, চীনের স্বার্থে বাস্তব ক্ষতি হয়—এমন যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে দেশটি 'প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা' নেবে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত 'মস্তিষ্ক' যুক্ত মানবসদৃশ রোবট ভবিষ্যতে ভোক্তা ও শিল্প—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার হবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য নির্ভরযোগ্য ইনভার্টারের উৎসের প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কম্পানিগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা আরেকটি বিরল খনিজের মতো পরিস্থিতি এড়াতে চান। প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাজারে চীনের আধিপত্য এতটাই বেশি যে, এসব খনিজে প্রবেশাধিকারকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় সুবিধা আদায় করতে পেরেছে বেইজিং।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত আরো চারটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবারের এই পদক্ষেপের পর এফসিসি সম্ভবত অনেক অ-চীনা সরবরাহকারীকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখবে। এর আগে বিদেশি ড্রোন ও রাউটারের ওপর সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও সংস্থাটি একই ধরনের ছাড় দিয়েছিল। নতুন এই ব্যবস্থা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে। তবে এটি শুধু সেই সব রোবট ও ইনভার্টার মডেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলো এখনো বাজারে আসেনি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির অনুমোদন পাওয়া মডেলগুলোর অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতাও এফসিসির রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনের প্রযুক্তিগত হুমকির বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আনেন বলে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তিনি চীনা কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগ এবং হুয়াওয়ের মতো চীনা টেলিযোগাযোগ জায়ান্টগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কার বিষয়েও জোরালোভাবে কথা বলেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে এসে ট্রাম্প এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে অনেক নরম অবস্থান নিয়েছেন। গত বছর বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে বেইজিংয়ের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের মুখে পড়েই তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ইউনিট্রি। প্রতিষ্ঠানটি মানবসদৃশ রোবট তৈরিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি। বিশ্ববাজারে তাদের অংশীদারিত্ব প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। চীনের যে তিনটি প্রতিষ্ঠান এই নতুন কিন্তু দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শিল্পে আধিপত্য করছে, ইউনিট্রি তাদের একটি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের সেই সব চীনা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করেছে, যাদের বিরুদ্ধে চীনের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মতে, এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আরো কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত হতে পারে। সম্প্রতি ইউনিট্রি এনভিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এই চুক্তির আওতায় ইউনিট্রির রোবটের 'মস্তিষ্ক' চালাতে এনভিডিয়ার অত্যাধুনিক ব্ল্যাকওয়েল চিপ ব্যবহার করা হবে। এনভিডিয়া জানিয়েছে, রোবট থেকে সংগ্রহ করা তথ্য যুক্তরাষ্ট্রেই থাকবে। এছাড়া ইউনিট্রির সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
চীনবিষয়ক কঠোর অবস্থানের সমর্থকদের আশঙ্কা, এসব রোবট যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে গুপ্তচরবৃত্তি করতে পারে। তারা তথ্য সংগ্রহ করে বেইজিংয়ে পাঠাতে পারে অথবা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এফসিসি মঙ্গলবার বলেছে, 'এসব রোবট এমন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যা খারাপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহার করতে পারে। এগুলো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এমনকি দূর থেকে রোবটের নিয়ন্ত্রণও নেওয়া সম্ভব হতে পারে।'
মিশিগানের রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জন মুলেনার, যিনি প্রতিনিধি পরিষদের চীনবিষয়ক বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান, বলেছেন এফসিসির এই পদক্ষেপ 'আমাদের দেশকে সুরক্ষা দেয় এবং দেশের রোবট শিল্পকে আরো শক্তিশালী করে।' জন মুলেনার আগে এমন একটি আইন প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে চীনের তৈরি রোবটের বিশেষ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে সেগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা রাখা হয়।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইনভার্টার তৈরি করে চীন। এই খাতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সানগ্রো পাওয়ার সাপ্লাই এবং হুয়াওয়ে। হুয়াওয়ের ওপর ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কম দামে পণ্য বিক্রি করে পশ্চিমা দেশগুলোর ইনভার্টার বাজারে নিজেদের অংশ বাড়িয়ে চলেছে বেইজিং। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের নেওয়া পদক্ষেপ এবং সিস্টেমে ক্ষতিকর সফটওয়্যার বসিয়ে দেওয়া বা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কার কারণে চীনের তৈরি ইনভার্টারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছিল এফসিসি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ২০২৩ সালে প্রকাশ্যে আসা 'ভোল্ট টাইফুন' নামে পরিচিত একটি হ্যাকিং অভিযানের মতো আরেকটি ঘটনা এড়াতে চায়। ওই অভিযানে হামলাকারীরা ব্যক্তিমালিকানাধীন রাউটারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এরপর সেগুলো ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চালানো পরবর্তী হামলা গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সৌর ফটোভোল্টাইক সেল, মডিউল বা ইনভার্টার কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর আওতায় চীনা কম্পানিগুলোও পড়ে। রয়টার্সের মন্তব্য জানতে চাওয়া অনুরোধের জবাবে ইউনিট্রি, সানগ্রো এবং হুয়াওয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন