প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ নিয়ে ফুটবল প্রেমীদের উত্তেজনা এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো জুড়ে। কিন্তু কেন এই টুর্নামেন্টটি ৩টি দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে? আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে।
শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আলাদাভাবে আবেদন করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরে তারা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ‘একতাবদ্ধভাবে এক হয়ে’ স্লোগান নিয়ে নিজেদের উপস্থাপন করে। ২০১৭ সালে উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশের ফুটবল সংস্থাগুলো তাদের জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় এবং এই যৌথ প্রস্তাবের নাম দেয়া হয় ‘ইউনাইটেড বিড’।
এর এক বছর পর রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত ফিফার ৬৮তম কংগ্রেসে সদস্য দেশগুলো ভোট দেয়। সেখানে ২০০ ভোটের মধ্যে ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয় ‘ইউনাইটেড বিড’। এর মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি হয়, কারণ ফিফা প্রথমবারের মতো ঘোষণা করে যে বিশ্বকাপ তিনটি দেশে আয়োজন করা হবে। টুর্নামেন্টের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এটি ছিল প্রথম ঘটনা।
ফিফা ৩২ দল থেকে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৮ দল করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে আরও একটি অতিরিক্ত নকআউট রাউন্ড যোগ করে। এর ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ—এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে ৪০টি ম্যাচ বেশি। এত বেশি ম্যাচ একক কোনো দেশের পক্ষে আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে একাধিক দেশ একসঙ্গে আয়োজন করার ধারণার পথ আরও সুগম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ বিডকে আরও শক্তিশালী করেছিল যে বিষয়টি, তা হলো তাদের প্রস্তাবে থাকা প্রতিটি স্টেডিয়াম আগেই নির্মিত ছিল। ফলে বড় কোনো নির্মাণকাজের প্রয়োজন হয়নি। গড়ে প্রতিটি স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৬৮ হাজারের বেশি। শুধু তাই নয়, সব সম্ভাব্য আয়োজক শহরেই আগে থেকেই বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন, চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য অবকাঠামো ছিল, যা ফিফার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ বা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বর্তমান সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ১৬টি শহরের ১৬টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে, যার অনেকগুলোতেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ফুটবল লিগ (এনএফএল), মেজর লিগ সসার (এমএলএস) এবং মেক্সিকোর শীর্ষ ফুটবল লিগ লিগা এমএক্সের ম্যাচ আয়োজন হয়ে থাকে।
যদিও বিশ্বকাপের আয়োজনের অধিকার তিনটি দেশ ভাগ করে নিয়েছে, তবুও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজন করবে যুক্তরাষ্ট্র—মোট ৭৮টি ম্যাচ, যা কানাডা ও মেক্সিকোর (প্রতিটিতে ১৩টি করে) সম্মিলিত ম্যাচের তিন গুণেরও বেশি। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালসহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর বেশিরভাগই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ তিনটি দেশে মিলিয়ে মোট প্রায় ৮০.১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন তৈরি করবে, যার মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হবে প্রায় ৩০.৫ বিলিয়ন ডলার।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফার সবশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা চার বছরের এক অর্থনৈতিক চক্রে (যা ২০২৬ বিশ্বকাপ দিয়ে শেষ হবে) মোট ১৩ বিলিয়ন ডলার আয় করবে, যার প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আসবে এই বছরেই।
তুলনামূলকভাবে কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে চার বছরের বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে ফিফা মোট ৭.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। রাশিয়া বিশ্বকাপকে ঘিরে ২০১৫–২০১৮ সালের চার বছরের চক্রে আয় হয়েছিল ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। আর প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক গেমস মোট ৫.২৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
সব মিলিয়ে সহজভাবে বলা যায়, উত্তর আমেরিকা জুড়ে আয়োজিত ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে যে আয় হবে, তা এটিকে এখনও পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনটি দেশের মধ্যে ভ্রমণের লজিস্টিক (যাতায়াত) জটিলতা কমানোর জন্য ফিফা ভেন্যুগুলোকে তিনটি আঞ্চলিক ক্লাস্টারে ভাগ করেছে। সেগুলো হলো:
পশ্চিমাঞ্চল: ভ্যাঙ্কুভার, সিয়াটল, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস।
মধ্যাঞ্চল: গুয়াদালাহারা, মেক্সিকো সিটি, মন্টেরে, হিউস্টন, ডালাস, কানসাস সিটি।
পূর্বাঞ্চল: আটলান্টা, মায়ামি, টরন্টো, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্ক বা নিউ জার্সি।
দলগুলো সাধারণত তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো একটি ক্লাস্টারের মধ্যেই খেলবে। তবে সব সময় তা নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিল তাদের গ্রুপ ‘সি’-এর সব ম্যাচ পূর্বাঞ্চলীয় ক্লাস্টারে খেলবে—নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া এবং মায়ামিতে।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের গ্রুপ ‘এ’ অভিযান শুরু করবে মধ্যাঞ্চলীয় ক্লাস্টারের মেক্সিকো সিটিতে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য তাদের পূর্বাঞ্চলের আটলান্টায় যেতে হবে। তারপর আবার মোন্টেরেতে ফিরে যেতে হবে।
আর গ্রুপ পর্বে সব দলের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ পথ থাকবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার। তাদের মোট ভ্রমণ দূরত্ব হবে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ১০০ মাইল)।
তারা তাদের টুর্নামেন্ট শুরু করবে টরন্টোতে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (২ হাজার ২০০ মাইল) দূরে লস অ্যাঞ্জেলেসে যেতে হবে। তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচ হবে আরও ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (৯০০ মাইল) দূরে সিয়াটলে।
যদিও কিছু দল গ্রুপ পর্বে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারবে। তবে তারা যদি আরও এগিয়ে যায়, তাহলে নকআউট পর্বে আবারও ক্লান্তিকর ভ্রমণের মুখে পড়তে পারে। কারণ ম্যাচগুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন