প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফান্দাউক দরবার শরীফ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম পরিচিত সুফি-আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। Fandauk Darbar Sharif
নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক এলাকায় অবস্থিত এ দরবারকে ঘিরে প্রতিবছর বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে বার্ষিক ইছালে ছওয়াব মাহফিল বা ‘ফান্দাউকের সভা’-কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন। ২০২৬ সালের বার্ষিক আয়োজনও দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি
দরবার-সংশ্লিষ্ট ইতিহাসে বলা হয়, আনুমানিক এক শতাব্দী আগে নাসিরনগরের নাছিরপুর সাহেববাড়ি থেকে সিপাহসালার সৈয়দ নাছির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশীয় সৈয়দ আফতাব উদ্দিন ফান্দাউক গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে তাঁর বংশধারাকে কেন্দ্র করে এলাকায় একটি আধ্যাত্মিক পরিবেশ গড়ে ওঠে।
ফান্দাউক দরবার শরীফের ইতিহাসে বিশেষভাবে দুজন পীর-মাশায়েখের নাম উল্লেখ করা হয়—হযরত শাহসূফী আলহাজ্ব সৈয়দ আব্দুস সাত্তার নকশেবন্দী মোজাদ্দেদী ফান্দাউকী (রহ.) এবং তাঁর পরবর্তী আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম ব্যক্তিত্ব হযরত শাহসূফী সৈয়দ নাছিরুল হক (মাছুম) আল-ক্বাদরী, চিশতী, নকশেবন্দী, মোজাদ্দেদী ফান্দাউকী (রহ.)। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁদের বার্ষিক ইছালে ছওয়াবের আয়োজনের কথা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও খানকার ভূমিকা
দরবার-সংশ্লিষ্ট ইতিহাসে বলা হয়েছে, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে এখানে খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফাতেহা শরীফ, মোরাকাবা ও জিকিরের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেওয়ার কথা ওই ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
দরবারের ঐতিহ্যবাহী কার্যক্রমের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা, জিকির-আযকার, মিলাদ ও ইছালে ছওয়াবের আয়োজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
ফান্দাউক দরবার শরীফের সঙ্গে যুক্ত ইতিহাসে ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
দরবার-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালে ফান্দাউক মদিনাতুল উলুম আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে ফান্দাউক মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এর পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিমূলক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠার কথাও দরবারের ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
পীর-মাশায়েখের উত্তরাধিকার
ফান্দাউক দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে হযরত শাহসূফী সৈয়দ আব্দুস সাত্তার (রহ.) ও হযরত শাহসূফী সৈয়দ নাছিরুল হক (মাছুম) (রহ.)-এর নাম বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে এসেছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সৈয়দ নাছিরুল হক (মাছুম) (রহ.)-কে মরহুমে ছানী পীরে কামেল, মুর্শিদে বরহক ও মোজাদ্দেদে জামান হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর উফাত দিবস পালনের সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
বর্তমানে দরবারের গদ্দীনশীন হিসেবে মাওলানা সৈয়দ ছালেহ আহমদ মামুন আল হোসাইন-এর নাম ২০২৬ সালের বার্ষিক ইছালে ছওয়াবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফান্দাউকের সভা
ফান্দাউক দরবার শরীফের সবচেয়ে বড় বার্ষিক আয়োজনগুলোর একটি হলো ‘ফান্দাউকের সভা’। সাধারণত দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে ওয়াজ, ধর্মীয় আলোচনা, জিকির ও ইছালে ছওয়াবসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় এবং শেষপর্যায়ে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
২০১৬ সালের একটি স্থানীয় প্রতিবেদনে মাহফিলকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি ও বিপুলসংখ্যক ভক্ত-মুরিদানের সমাগমের কথা বলা হয়েছিল।
২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে আয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালেও হযরত সৈয়দ আব্দুস সাত্তার (রহ.) ও হযরত সৈয়দ নাছিরুল হক (মাছুম) (রহ.)-এর বার্ষিক ইছালে ছওয়াব উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ফান্দাউকের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
বর্তমান প্রভাব ও ঐতিহ্য
ফান্দাউক দরবার শরীফকে ঘিরে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক যোগাযোগের পরিমণ্ডলও গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত আশেকান-মুরিদান ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এসব আয়োজনে অংশ নেন।
দরবারের অনুসারীদের মতে, শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফতের শিক্ষা এবং আত্মশুদ্ধির চর্চার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নই এই ধারার অন্যতম লক্ষ্য। দরবার-সংশ্লিষ্ট ইতিহাসে কুসংস্কারমুক্ত সমাজ ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারের কথাও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে ফান্দাউক দরবার শরীফ নাসিরনগরসহ বৃহত্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশে পরিণত হয়েছে। পীর-মাশায়েখের স্মৃতি, খানকা ও মাদরাসা, নিয়মিত ধর্মীয় আয়োজন এবং বার্ষিক ইছালে ছওয়াব মাহফিলের মধ্য দিয়ে এর ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান রয়েছে।
ফান্দাউক দরবার শরীফের ইতিহাস মূলত একটি আধ্যাত্মিক ধারার ইতিহাস—যেখানে পীর-মাশায়েখের শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা এবং মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার কথা গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন