প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সরকারের অনুমতি পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে—পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটি মন্তব্য করেছে যে, এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার এক বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি এই বক্তব্য প্রত্যাহার, আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিত এবং প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটি একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আইজিপিকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে।
টিআইবি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। এই সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার’ অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে টিআইবি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সেই প্রশ্নও আমরা তুলছি।
তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং এটি পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এই দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। কোনো সরকারের অনুমতিই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।
অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ার দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনা এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যাব সদস্যদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ। অতীতের এসব শিক্ষা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশপ্রধানের এমন বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই যদি ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনেন, তবে তাঁর দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
টিআইবি প্রশ্ন তুলেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ার করবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই তা দমন সম্ভব। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ার চালুর সম্ভাবনা সামনে আনছেন? সরকারের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে আইজিপির এই বক্তব্যের অসংগতির ব্যাখ্যা এবং তাঁর জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, বক্তব্য প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন