প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
"গরুকে রক্ষা করার জন্য একজন মানুষকে হত্যা করা হিন্দু ধর্ম এবং অহিংসার স্পষ্ট লঙ্ঘন।" — মহাত্মা গান্ধীর এই ঐতিহাসিক উক্তি দিয়ে কলামিস্ট মণি শংকর আইয়ার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে নিবন্ধটি শুরু করেছেন। নিবন্ধে ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের একটি ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর দুটি নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত রিপোর্ট অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রথম প্রতিবেদনটি জাফরুল-ইসলাম খান সংকলিত ৭৫০ পৃষ্ঠার একটি সুবৃহৎ প্রতিবেদন। এতে ২০১৪ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত এক দশকে ঘটে যাওয়া ১ হাজার ৭৪৩টি ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনির ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ও সূত্র তুলে ধরা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, এই ১০ বছরের সময়ে গড়ে প্রতিবছর ১৭৪টি এবং প্রতি দুই দিনে অন্তত একটি করে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। তবে অপরাধীরা আইনি শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ফলে এই হার দিন দিন আরও বেড়েছে এবং শেষের দিকে তা প্রায় প্রতিদিন একটি করে গণপিটুনিতে গিয়ে ঠেকেছে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণপিটুনির সিংহভাগ ঘটনাই ঘটেছে উত্তর ভারতের গঙ্গা অববাহিকা ও পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। বিপরীতে, দক্ষিণ ভারতের অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে এই রেকর্ড তুলনামূলক অনেক কম।
দ্বিতীয় রিপোর্টটি বিশিষ্ট সমাজকর্মী হর্ষ মান্দারের লেখা ২৬০ পৃষ্ঠার বই—‘ইট স্টার্টেড উইথ ওয়ার্ডস’ (শুরুটা হয়েছিল শব্দ দিয়ে)। এতে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ‘নয়া ভারতে ঘৃণা ভাষণের (হেইট স্পিচ) মহামারি’ ছড়িয়ে পড়েছে। হর্ষ মান্দারের মতে, প্রথমে ‘শব্দ’ বা বক্তব্যের মাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেই উসকানিতে ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে সঠিক বলে বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রসারই এই সামাজিক ব্যাধির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, সংঘবদ্ধ দলগুলোকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ২ জুন পুনেতে মহসিন শেখ নামের এক তরুণকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র সেনা’-র কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে। সেটিই ছিল এই ধারার সূচনা। পরবর্তীতে বিচার বিভাগীয় নানা জটিলতা ও জামিনের পর দীর্ঘ ৯ বছর পর সব আসামি খালাস পেয়ে যায়।
একইভাবে ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরির বিসাদা গ্রামে মোহাম্মদ আখলাককে ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার গুজবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় তা গরুর মাংস প্রমাণিত না হলেও আখলাকের জীবন আর ফিরে আসেনি। এই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অন্যতম অভিযুক্ত রবি সিসোদিয়া ২০১৬ সালে মারা গেলে তার কফিনে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে সম্মান জানানো হয়েছিল এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় এক মন্ত্রী তার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। ১০ বছর পর সম্প্রতি রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং সমস্ত আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সহিংসতার শিকার কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ই নয়; হিন্দু, দলিত, আদিবাসী, খ্রিস্টান ও শিখদের ওপরেও আক্রমণ চালানো হয়েছে। সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে নিহত ও আহত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মের নাগরিকও রয়েছেন (৭৮৭ জন নিহত ও ৩২৭ জন আহত)। তবে আহতদের সংখ্যার বিচারে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ (৬৩৪ জন আহত)।
এর একটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ হলো রাজস্থানের উদয়পুরে কলাইয়ের কাজ করা হিন্দু দর্জি কানহাইয়া লাল তেলির নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ‘দাওয়াত-ই-ইসলামি’র দুই সদস্য একটি ১২ বছরের শিশুকে দিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছিল। অপরাধ করে ছাড় পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এবং শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘৃণা ভাষণ কিভাবে সমাজে নির্মমতাকে সাধারণ বিষয় বানিয়ে দিয়েছে, এই ঘটনা তারই সাক্ষ্য দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরু রক্ষার নামে যে নজরদারি বা ‘ভিজিল্যান্টিজম’ শুরু হয়েছিল, তা এখন যেকোনো তুচ্ছ ঘটনাতেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বুলডোজার সংস্কৃতি, ভুয়া এনকাউন্টার এবং গণমাধ্যমের একাংশের পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন।
বর্তমানে শুধু গবাদিপশু পরিবহনই নয়, কেবল ‘মুসলিম চেহারার’ হওয়ার কারণেও অনেকে হামলার শিকার হচ্ছেন। দেশটিতে গণপিটুনিবিরোধী কঠোর আইনের অভাব এই অপরাধীদের আরো বেপরোয়া করে তুলছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন