প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পর্ষদ বাতিলের পর ব্যাংকের কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি কয়েক দিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করেছিল, তা বেশ কিছুটা কমেছে। ফলে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কমার পাশাপাশি গ্রাহকরা আবারও মেয়াদি আমানত হিসাব পুনরায় চালু করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তদুপরি, অচল হয়ে থাকা এটিএম বুথ ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও পুনরায় চালু হয়ে গেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন শাখা ঘুরে এবং ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার নগদ অর্থ উত্তোলনের তুলনায় জমার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬৪ কোটি টাকা। তবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা স্থানান্তর হওয়ায় দিন শেষে ব্যাংকের নিট অবস্থান প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। এর আগে এই ঋণাত্মক অবস্থান প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মধ্যে ছিল।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আগের কয়েক দিনের আটকে থাকা ইএফটি ও আরটিজিএস লেনদেন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে এবং সে কারণে এখনো কিছুটা চাপ রয়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
এদিকে আতঙ্কের কারণে যেসব গ্রাহক সম্প্রতি মেয়াদি আমানত হিসাব ভেঙে ফেলেছিলেন, তাদের মধ্যে কিছু গ্রাহক আবার ফিরে আসছেন। ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসাবের মধ্যে ৫০২ জন গ্রাহক পুনরায় হিসাব চালু করেছেন। এতে নতুন করে ৪৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে।
সোমবার ইসলামী ব্যাংকের একটি ঘোষণায় বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে আতঙ্কিত হয়ে যারা ১ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে মেয়াদি আমানত আগাম নগদায়ন করেছেন, তারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে পুনরায় হিসাব সচলের আবেদন করতে পারবেন। এই আবেদনের ফলে আগের সব সুবিধা বহাল রেখে হিসাব পুনরায় চালু করা হবে। সাধারণত মেয়াদ পূর্তির আগে আমানত ভাঙলে সঞ্চয়ী হিসাবের হারে মুনাফা প্রদান করা হয়। ব্যাংকটির এ ঘোষণার পর অনেক গ্রাহক আবার মেয়াদি হিসাব চালুর জন্য যোগাযোগ করছেন।
রাজধানীর হেড অফিস কমপ্লেক্স করপোরেট শাখার প্রধান মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন মন্তব্য করেন, আগের তুলনায় টাকা উত্তোলনের চাপ কমেছে। অনেক গ্রাহক মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) হিসাব পুনরায় চালু করার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার একজন গ্রাহক তার এমটিডিআর হিসাব পুনরায় চালু করে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ এটিএম বুথ অচল হয়ে পড়েছিল। ফলে গ্রাহকরা বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করতে সক্ষম হননি। তবে মঙ্গলবার মতিঝিল এলাকায় দেখা গেছে, ব্যাংকের এটিএম বুথগুলো আবার চালু হয়েছে এবং গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করছেন।
কারওয়ান বাজার শাখার গ্রাহক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি মঙ্গলবার অনলাইনে তিন লাখ টাকা অন্য একটি হিসাবে স্থানান্তর করতে পেরেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা ফেরার ইঙ্গিত মিলছে। আজাদুল ইসলাম আদনান নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, পর্ষদ পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তিনি। এতে তার মধ্যে কিছুটা আস্থা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকের রংপুর ধাপ শাখার একজন গ্রাহক ৯ জুন ৩ লাখ টাকার এমটিডিআর ভেঙে নিয়ে যান, পুনরায় ব্যাংকের আহ্বানে জমা দেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা।
ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিসের প্রধান জাকির হোসাইন জানান, আগের তুলনায় নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে। ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙানোর প্রবণতাও অনেক কমে এসেছে। বর্তমানে এটিএম বুথ ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সচল রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার মন্তব্য করেন, গ্রাহকরা বর্তমানে এটিএম বুথ থেকে লেনদেন করতে পারছেন। তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। খুব শিগগিরই অনলাইন লেনদেন পূর্ণাঙ্গভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
ঈদ উপলক্ষে গত ২৪ মে সন্ধ্যার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত ১ জুন থেকে আন্দোলন করে আসছে একদল গ্রাহক। আতঙ্কের কারণে প্রচুর টাকা উত্তোলনের ফলে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গত সপ্তাহে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চাওয়ার পরিস্থিতিতে চলে যায়।
গত রোববার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি নতুন পরিচালন পর্ষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পালন করবেন। সোমবার তিনি ব্যাংকে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত পাঁচ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমানতকারীদের নির্বিঘ্নে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার অনুরোধ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন