প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ একদল শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি খরচে পাহাড় ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। কুমিল্লায় গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি মাইক্রোবাসে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করেছেন।
সফরসঙ্গী এক কর্মকর্তা ফেসবুকে পাহাড় ভ্রমণের ভিডিও পোস্ট করার পর পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসে এবং এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সরকারি অর্থের অপব্যবহার করে এ ধরনের প্রমোদভ্রমণ নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অতিরিক্ত অভিযোগ এসেছে যে, চেয়ারম্যান বোর্ডে অনুপস্থিত থাকাকালে সচিব প্রফেসর ড. আব্দুর রউফকে শীর্ষ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বভার দিয়ে যান। শীর্ষ কর্মকর্তাদের একযোগে অনুপস্থিতির ফলে বোর্ডে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) শারীরিক শিক্ষা বিভাগ ও কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ৬ অক্টোবর ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান।
এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে রাজশাহী বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে বিশাল বহর গঠন করেন। সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফফাত জেরীন, কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান, বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান, উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ইব্রাহিম, প্রোগ্রামার মাইনুল অর রশিদ, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (সনদ ও রেকর্ডস) মঞ্জুর রহমান খান, উপ-সচিব (ভাণ্ডার) দুরুল হোদা, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) জাহিদুর রহিম, সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আমিনুল করিম, সহকারী সচিব আওলাদ হোসেন, সহকারী কলেজ পরিদর্শক গোলাম নবী, একান্ত সচিব হাসান আলী এবং মোটরযান ক্লিনার রবিউল ইসলাম।
অফিস আদেশের সফরসূচিতে চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন—৫ অক্টোবর রাজশাহী থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়ে ৬ অক্টোবর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন। ৭, ৮ ও ৯ অক্টোবর কুমিল্লা বোর্ডেই অবস্থান করবেন এবং ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে রাজশাহীতে ফিরবেন। তবে বাস্তবে চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কর্মকর্তারা দুটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে কুমিল্লা যান। ৬ অক্টোবর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান যোগ দেন। কিন্তু পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে পুরো বহর রওনা দেয় রাঙ্গামাটির সাজেকের উদ্দেশে।
একটি মাইক্রোবাসে ছিলেন বোর্ড চেয়ারম্যান শামীম আরা চৌধুরী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইফফাত জেরীন, কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান, বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) জাহিদুর রহিম এবং তার ভাই সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আমিনুল করিম। অন্য গাড়িতে ছিলেন বাকি কর্মকর্তারা। দুপুরে তারা সাজেকে পৌঁছান। সেখানে ঘোরাঘুরি শেষে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে রাতে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন।
জাহিদুর রহিম তার ফেসবুক আইডিতে সাজেক ভ্রমণের ভিডিও পোস্ট করার পর রাজশাহীতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে চেয়ারম্যান সতর্ক হন। সূচি অনুযায়ী ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকার কথা থাকলেও তারা ৮ অক্টোবর সকালে খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। ওই রাতে ঢাকার বোর্ড গেস্ট হাউসে অবস্থানের পর ৯ অক্টোবর সকালে একটি দল এবং সাড়ে ১০টায় অপর দল রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হয়।
বোর্ড সূত্র জানায়, এ সফরকে সরকারি ভ্রমণ হিসেবে দেখিয়ে বোর্ডের ক্রীড়া তহবিল থেকে অগ্রিম দেড় লাখ টাকা উত্তোলন করেছিলেন চেয়ারম্যান। এরপর অনুসারী কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি পাহাড়ে যান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত এ ধরনের প্রতিযোগিতায় চেয়ারম্যান, সচিব, বিদ্যালয় পরিদর্শক ও ক্রীড়া কর্মকর্তা অংশ নেন; কিন্তু এবার ক্রীড়া কর্মকর্তাকে বহরে রাখা হয়নি। উল্টো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাব ও নিরীক্ষা কর্মকর্তা, প্রোগ্রামার কিংবা ভাণ্ডার শাখার কর্মকর্তাদের সেখানে কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও জানা যায়, চেয়ারম্যান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা সফরে থাকায় বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফকে একাই চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্ব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ, বিদ্যালয় এবং কলেজ পরিদর্শকের বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে। একসঙ্গে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তিনি হিমশিম খান এবং দাপ্তরিক কাজে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সেবাগ্রহীতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, কুমিল্লায় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম ব্যবহার করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সরকারি খরচে এই আনন্দভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিল; কিন্তু ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করার পর তা জানাজানি হওয়ায় তারা তড়িঘড়ি করে ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে ফিরতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী দাবি করেন, "আমি পাহাড় ভ্রমণে যাইনি। কুমিল্লা শহরের আশপাশে থাকা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছি। সরকারি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ ভিত্তিহীন। জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সব বোর্ডের কর্মকর্তারাই অংশ নেন। আমাদের অনুপস্থিতির কারণে সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তিতে পড়েননি, কারণ সংশ্লিষ্ট পদের অধস্তন কর্মকর্তারা কাজ করেছেন।"
তবে ওই বহরে থাকা এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে চেয়ারম্যানসহ সবাই পাহাড়ে গিয়েছিলেন।
সাজেকের ভিডিও পোস্ট করা উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জাহিদুর রহিম বলেন, "মানুষের কি ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে না? কেউ কি ঘুরতে যেতে পারবে না?"
কলেজ পরিদর্শক মাহবুব হাসান বলেন, "পাহাড় ভ্রমণে গিয়েছিলাম কিনা তা বলব না। অফিসে আসেন, কথা বলব।" তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ১০ অক্টোবর সমাপনী অনুষ্ঠান থাকলেও তারা ৯ অক্টোবরই রাজশাহী ফিরে এসেছেন।
সরকারি খরচে কর্মকর্তাদের এই ভ্রমণের বিষয়ে রাজশাহী বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুর রউফ বলেন, "কুমিল্লা বোর্ডের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী অংশ নেন। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন বলে আমি জানি। তারা কুমিল্লাতেই থাকবেন বলে আমাদের জানানো হয়েছিল; কিন্তু কেউ যদি পাহাড় ভ্রমণে গিয়ে থাকেন, তা আমার অজান্তেই হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে; সন্তোষজনক জবাব না পেলে বিধিমোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন